সব
facebook apsnews24.com
দেনমোহর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতা - APSNews24.Com

দেনমোহর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতা

দেনমোহর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতা

মুহাম্মদ তাজুল ইসলাম

দেনমোহর (Dower) বিয়ের সময় মুসলিম নারীর একটি অন্যতম পরিশোধ ও আদায়যোগ্য পাওনা, যা স্বামী কর্তৃক অবশ্যই পরিশোধযোগ্য। মুসলিম বিয়েকে দেওয়ানি চুক্তি (Civil Contact) বলা হয়, যেখানে প্রতিদান হিসেবে থাকে নির্দিষ্ট মোহরানা।

মুসলিম আইন অনুযায়ী, মুসলিম বিয়ে বৈধ হওয়ার জন্য যেসব শর্ত পালন করতে হয়, তার মধ্যে দেনমোহর আদায় করা অন্যতম। ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১’ অনুযায়ী, ‘দেনমোহরের অর্থ তলব করা মাত্রই তা স্ত্রীকে দিয়ে দিতে হবে।

‘মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯’ অনুসারে, ‘অত্র আইনের বিধৃত কোনো কিছু মুসলিম আইন অনুসারে বিবাহিতা কোনো স্ত্রীলোকের প্রাপ্য মোহর বা তাহার কোনো অংশের অধিকারী তাহার বিবাহ বিচ্ছেদের দ্বারা প্রভাবিত হইবে না। এমনকি মৃত্যুর পরে ও না।’

দেনমোহর বলতে মুসলিম বিয়েতে স্বামীর কাছ থেকে বাধ্যতামূলক প্রাপ্ত অর্থ কিংবা মূল্যবান সামগ্রীকে বোঝায়, যা স্ত্রীকে সম্মান ও মর্যাদাস্বরূপ এবং বিয়ের প্রতিদান হিসেবে দেয়া হয়। স্ত্রীকে সম্মান বা মর্যাদা প্রদর্শন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়ার লক্ষ্যেই মুসলিম বিয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে দেনমোহরের বিধান স্বীকৃত ও প্রচলিত।

পবিত্র কোরআনে ঘোষণা হয়েছে, ‘আর তোমরা স্ত্রীদের তাদের মোহর দিয়ে দাও খুশিমনে’ (সুরা নিসা: ৪)। আরও বলা আছে, ‘তাকে তার নির্ধারিত মোহর অর্পণ করবে’ (সুরা নিসা: ২৪)। দেনমোহর হলো কিছু টাকা বা অন্য কোনো সম্পত্তি যা স্বামী তার স্ত্রীকে বিয়ের চুক্তি অনুযায়ী দিয়ে থাকে। এটি স্ত্রীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নিদর্শন হিসেবে স্বামীর ওপর আরোপিত একটা দায়িত্ব। বিয়ে করলে প্রত্যেক মুসলিম মেয়েই তার স্বামী থেকে এমন টাকা বা সম্পত্তি দেনমোহর হিসেবে পাওয়ার হকদার। স্বামী তা দিতে বাধ্য।

স্ত্রীর মোহর ফাঁকি দেওয়া অতি হীন কাজ। কারণ এর অর্থ দাঁড়ায়, ভোগ করতে রাজি, কিন্তু বিনিময় দিতে রাজি নয়। যে স্বামীর মনে স্ত্রীর মোহর আদায়ের ইচ্ছাটুকুও নেই হাদীস শরীফে (মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/৫২২-৫২৩) তাকে বলা হয়েছে ‘ব্যাভিচারী’।

মুসলিম বিয়েতে দেনমোহর অবশ্যই থাকতে হবে, এমনকি তালাক হয়ে যাওয়া দম্পতির মধ্যে পুনরায় বিয়ে হলেও নতুন করে দেনমোহর নির্ধারিত হতে হবে। দেনমোহর স্ত্রীর কাছে স্বামীর জামানতবিহীন ঋণ, স্ত্রীর প্রাপ্য দেনমোহর পরিশোধ করা একজন স্বামীর নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব, যেটি থেকে অব্যাহতি লাভের কোনো সুযোগ তার নেই, যদি না স্ত্রী স্বতঃপ্রণোদিত ও পুরোপুরি প্রভাবহীন মনোভাব নিয়ে তা মাফ করে দেন।

মুসলিম নারীর যতগুলো আইনগত অধিকার আছে তার মধ্যে দেনমোহর অন্যতম। স্ত্রীর কাছে বিয়ের সময় থেকে তা স্বামীর ঋণ (Debt) হয়ে থাকে যত দিন না তা পুরোপুরি পরিশোধ করা হয়। এমনকি আদালতের মাধ্যমে বা কাবিননামায় ১৯ নং কলামের প্রদত্ত ক্ষমতাবলে কোনো মুসলিম নারী তার স্বামীকে তালাক দিলেও ওই নারীর দেনমোহর পাওয়ার এই অধিকার চলে যায় না। দেনমোহর পরিশোধের দায় থেকে অব্যাহতি লাভের কোনো সুযোগ একজন স্বামীর না থাকলেও পরিশোধের ‘তাড়া’ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার আইনি সুযোগ কিন্তু তার থাকে, যদি অপরিশোধিত দেনমোহরটি ‘বিলম্বিত’ প্রকৃতির হয়। কারণ, বিলম্বিত দেনমোহর স্ত্রী যখন ইচ্ছা তখন চাইতে পারেন না বা চাইলেও স্বামী তা পরিশোধ করতে বাধ্য নন।

আইন মতে, দুটি অবস্থার যে কোনটি ঘটলেই কেবল বিলম্বিত দেনমোহর চাওয়ার অধিকার স্ত্রীর তৈরি হয়। এক. যদি স্বামীর মৃত্যু হয় বা অন্যভাবে তাঁদের মধ্যকার বৈবাহিক সম্পর্ক ভঙ্গ হয়ে যায়; এবং দুই. যদি স্বামী সালিসি পরিষদ তথা স্ত্রীর বিনা অনুমতিতে পরবর্তী স্ত্রী গ্রহণ করেন। দেনমোহরের উদ্দেশ্য হিসেবে শুরুতে যা বলা হয়েছে তার বাইরে দাম্পত্য সম্পর্ক বলবৎ বা শান্তিপূর্ণ রাখার পেছনেও দেনমোহরের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। একজন স্বামী যখন জানবেন যে স্ত্রীকে তালাক দিলেই বিলম্বিত (ধার্যকৃত সমুদয় দেনমোহরের বৃহদাংশই সাধারণত বিলম্বিত থাকে)। যদিও অবাধ্য স্ত্রীর আচরণে দাম্পত্য কষ্টে আছেন, এমন স্বামীদের ক্ষেত্রে এরূপ অবস্থা কাঙ্ক্ষিত নয় কিংবা পারস্পরিক মনের টান না থাকলে বাহ্যিক বাধার চাপে পড়ে দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা স্বাস্থ্যকরও নয়, তবুও আমাদের সমাজে খেয়ালি ও স্ত্রী-সন্তানদের প্রতি দায়িত্বহীন এমন কিছুসংখ্যক স্বামীও রয়েছেন, যাদের বাহ্যিক চাপ দিয়েই দাম্পত্য জীবনে বেধে রাখতে হয়। আবার এমন স্ত্রীও বিরল নয়, যিনি শান্তিপূর্ণ বৈবাহিক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেয়ে বিভ্রান্তি বা তাৎক্ষণিক লাভের বশবর্তী হয়ে দেনমোহর আদায়ে সচেষ্ট থাকেন এবং সেজন্য স্বামীর ওপর জোরজবরদস্তি এমনকি মামলা করতেও পিছপা হন না।

মুসলিম বিয়েতে দেনমোহরের পরিমাণ কত হবে তা নির্দিষ্ট নয়। তবে দেনমোহর নূ্ন্যতম ১০ দিরহাম (প্রায় ২১০ টাকা) বা সমপরিমাণ অর্থের চেয়ে কম নির্ধারণ করা যাবে না। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতায় আমাদের দেশে দেনমোহরের পরিমাণ প্রায়ই বেশি নির্ধারিত হয়ে থাকে। অধিকাংশই মনে করে স্বামী যাতে সহজে স্ত্রীকে খেয়াল খুশি মতো তালাক দিতে না পারে তাই সমাজে এই প্রবণতার সৃষ্টি। আর দেনমোহরের পরিমাণ যাই হোক, প্রকৃতপক্ষে বিবাহিতা নারীরা ঠিকভাবে তাদের প্রাপ্য দেনমোহর আইনত পাচ্ছে কিনা তা দেখতে হবে! নাকি বিয়ের দেনমোহরের পরিমাণটা এখন সমাজে লোক দেখানো বিষয়ে পরিণত হয়েছে মাত্র!

অথচ প্রায়ই দেখা যায় শুধু দেনমোহরের পরিমাণ নির্ধারণ করা নিয়ে অনেক বিয়ে প্রাথমিকভাবে ভেঙে যায়। মুসলিম আইনবিদদের মতে দেনমোহরের পরিমাণ যুক্তিসঙ্গত ও বরের সামর্থ্যের মধ্যে হওয়া উচিত। এটি বর-কনে পক্ষ মিলে ঠিক করবে। এটি নির্ভর করে পাত্র-পাত্রীর পেশা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক মর্যাদা, পাত্রের সম্পদের পরিমাণ, পাত্রীর সৌন্দর্য, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে। অন্যভাবে পরিবারের বিবাহিত অন্যান্য নারীর জন্য ধার্য দেনমোহরের সঙ্গে তুলনা করেও তা নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। কাবিননামায় অবশ্যই দেনমোহরের পরিমাণ লিখতে হবে। তবে কোনো কারণে দেনমোহর ধার্য না করে বিয়ে সম্পন্ন হয়ে গেলে বিয়ের পরে তা যুক্তিসঙ্গতভাবে নির্ধারণ করে নেয়া যাবে।

দেনমোহরআদায়েরপদ্ধতি

মুসলিম আইনে দেনমোহরকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। নগদ (Prompt) দেনমোহর আর বাকি (Deferred) দেনমোহর। কোনটা কতটুকু প্রদান করা হবে তা বর-কনে উভয়পক্ষ আলোচনা করে নির্ধারণ করে নেবে। বিয়ে সম্পন্ন করার সময় কাজির উপস্থিতিতে নগদ দেনমোহর স্বামী সঙ্গে সঙ্গে পরিশোধ করবে, যদি স্ত্রী তেমনটি চায়। পুরোটা পরিশোধ না করলে বাকি দেনমোহর স্ত্রী ইচ্ছা করলে পরে আদায় করতে পারবে। দেনমোহর কিভাবে পরিশোধ করা হবে, তা স্পষ্ট করে ঠিক করা না হলে পুরোটাই নগদ দেনমোহর হিসেবে ধরা হবে। তখন স্ত্রী দেনমোহর চাওয়া মাত্র স্বামী দিতে বাধ্য থাকবে। প্রয়োজনে স্বামীর কাছ থেকে দেনমোহরের অর্থ আদায় করার জন্য আইনের আশ্রয় নেয়া যাবে। তাছাড়া স্ত্রী তার সম্পূর্ণ দেনমোহর আদায় না করা পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য-মিলন (Consummation) করতেও অস্বীকার করতে পারবে। তাই একবার বিয়ে ঠিকভাবে সম্পন্ন হলে এবং স্বামী দেনমোহর দিতে অস্বীকার করলে, নির্ধারিত মোহর আদায় করতে স্ত্রী আইনের দ্বারস্থ (Legal Action) হতে পারবে।

মুসলিম পারিবারিক আইন ১৯৬১ (Muslim Family Law Ordinance 1961) অনুযায়ী সালিশি পরিষদের অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করলে স্বামীকে অবিলম্বে তার বর্তমান স্ত্রীর বা স্ত্রীদের তাৎক্ষণিক Prompt (নগদ) অথবা বিলম্বিত (বাকি) দেনমোহরের যাবতীয় টাকা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু অর্থ পরিশোধ করা না হলে তা বকেয়া রাজস্বের মতো আদায় হবে। বিয়ের চুক্তিতে দেনমোহর পরিশোধের পদ্ধতি নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলে দেনমোহরের সমগ্র অর্থ ‘চাওয়া মাত্র প্রদেয়’ বলে ধরে নিতে হবে। আবার স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য-মিলন অর্থাৎ সহবাসের আগে বিবাহবিচ্ছেদ হলে কিংবা স্বামীর মৃত্যু হলে, সম্পূর্ণ দেনমোহরের অর্ধেক পরিশোধ করতে হয়।

১৯৮৫ সালের মুসলিম পারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ (Muslim Family Court Ordinance 1985) অনুসারে, দেনমোহরের পরিমাণ যা-ই হোক না কেন, তা আদায়ের জন্য স্থানীয় পারিবারিক আদালতে মামলা করতে হয়। বিবাহ-বিচ্ছেদের তিন বছরের মধ্যে এই মামলা করতে হয়।

স্ত্রীআগেতালাকদিলেকিদেনমোহরদিতেহয়?

মনে রাখতে হবে, স্বামী বা স্ত্রী যিনিই তালাক দিন না কেন, দেনমোহরের টাকা অবশ্যই স্ত্রীকে দিতে হবে। তবে বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য জীবনযাপন না হলে কিংবা স্বামীর মৃত্যু হলে দেনমোহরের অর্ধেক পরিশোধ করা যাবে। তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর কারণে বা অন্য কোনো কারণে স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হলেও স্ত্রী তার স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার উত্তরাধিকারীদের কাছে এই দাবি করতে পারবে। আবার স্বামীর আগে স্ত্রী মারা গেলেও দেনমোহর মাফ হয় না। স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা এই দেনমোহরের হকদার। তারাও মামলা করার অধিকার রাখে। যদি স্ত্রীর মোহরানা পরিশোধ করা না হয়ে থাকে, তবে অন্যান্য ঋণের মতোই প্রথমে স্বামীর মোট রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে মোহরানা পরিশোধ করতে হবে। বাকি সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করা হবে যেখানে মোহরানা দেয়ার পরেও স্ত্রী আবার উত্তরাধিকারী স্বত্বে তার অংশ পাবে।

মোহরানা পরিশোধ করায় যদি মৃত স্বামীর সম্পত্তি আর অবশিষ্ট না থাকে, তবে অন্যান্য ঋণের মতো সম্পূর্ণ সম্পত্তি মোহরানা বাবদ স্ত্রীকে সমর্পণ করতে হবে। ফলে ওয়ারিশরা আর কোনো অংশ পাবে না।

বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে গেলে বা স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রী তাঁর দেনমোহর আদায়ের জন্য পারিবারিক আদালতে মামলা করে তা আদায় করতে পারেন। তবে  অবশ্যই তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর তিন বছরের মধ্যে মামলা করতে হবে। স্বামীর মৃত্যু হলেও বকেয়া দেনমোহর একটি ঋণের মতো। এটি শোধ করতেই হয়। স্বামীর উত্তরাধিকারীরা এটি প্রদানে বাধ্য। অন্যথায় মৃত স্বামীর উত্তরাধিকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করে আদায় করা যায়। স্ত্রী আগে মারা গেলেও দেনমোহর মাফ হয় না। স্ত্রীর উত্তরাধিকারীরা এই দেনমোহরের হকদার। তারাও মামলা করার অধিকার  রাখে।

আমাদের সমাজে অধিকাংশ মানুষ মনে করে, স্বামী বা স্বামীর পরিবার থেকে দেনমোহর আদায় করার জন্য শুধু সরাসরি আদালতেই মামলা করতে হয়। তাই অনেকে সংসার ভেঙে যাওয়ার পরেও বা স্বামী অকারণে স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পরেও থানা-কোর্টের ভয়ে দেনমোহর দাবি করার সাহসটুকু পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেন। এতে একদিকে যেমন ভুক্তভোগী মেয়েটি আর্থিক নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে অন্যদিকে কিছু পুরুষ এই সুযোগে ইচ্ছেমতো আরও বিয়ে করতে উৎসাহিত হয়, যা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন সামাজিক অসঙ্গতি সৃষ্টি করে। কিন্তু দেনমোহর আদায় করতে হলে সরাসরি আদালতে মামলা না করে স্থানীয় চেয়ারম্যান বা কমিশনারের সহায়তা নিয়েও তা আদায় করা যায়।

সবচেয়ে ভালো হয় কোনো মানবাধিকার সংস্থা বা এনজিও যেমন: ব্লাস্ট (BLAST), বিএইচআরএফ, আসক, অধিকার, বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতি (BNWLA) ইত্যাদি সংগঠনের সহায়তা নেয়া। দেশের বিভিন্ন জেলায় এসব সংগঠনের অনেক শাখা রয়েছে। এসব সংগঠন কর্তৃক পরিচালিত আপস-সালিশের মাধ্যমে সহজে ও কম সময়ে কোনো ভুক্তভোগী তার প্রাপ্য দেনমোহর আদায় করতে পারে। এছাড়া এখন সরকার পরিচালিত বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমেও দেনমোহর আদায় করার ব্যবস্থা রয়েছে।

নারীর আর্থিক নিরাপত্তার পাশাপাশি দেনমোহরকে পুরুষদের একচ্ছত্র তালাকের অধিকারকে খর্ব করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। স্বামীর মৃত্যু কিংবা স্বামীর কাছ থেকে তালাকপ্রাপ্ত হওয়ার পর যাতে স্ত্রীদের দুর্দশায় জীবন কাটাতে না হয়, সে কারণে একটি সময়োপযোগী ও উপযুক্ত দেনমোহর ধার্য করতে হবে। তবে স্বামীর আয় ও সামাজিক মর্যাদার ওপর অধিক নজর দিতে হবে, যাতে অতিরিক্ত দেনমোহর তার মাথার ওপরে অতিরিক্ত বোঝা হয়ে না দাঁড়ায় এবং তা পরিশোধে অসমর্থ হয়। বর্তমান সমাজ দেনমোহরকে লোক দেখানো ও প্রতিযোগিতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। স্ত্রী পক্ষের লোকরা অধিক পরিমাণ দেনমোহর ধার্য করলেও তা পরিশোধ করতে হবে না।এই ধ্যান-ধারণা নিয়ে তা মেনে নেয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কোনো কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ হলে সম্পূর্ণ টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ার ফলে শেষ পর্যন্ত জীবন শেষ করে দেবার মতো ঘটনা ঘটে।

বর্তমানে তথাকথিত আধুনিক কিছু নারী মোহরানা নিয়ে বাণিজ্যিক মনোভাব গড়ে তুলেছেন এবং পরকীয়ার মতো জঘন্য কর্মকাণ্ডের ফলে বিবাহ বিচ্ছেদের হার আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে যাচ্ছে।

বর্তমান সমাজে পুরুষদের কাছে বিয়ের মতো পবিত্র কাজ অধিক পরিমাণ মোহরানা ধার্যের ফলে কঠিন হয়ে গেছে। যৌতুক নেয়া যেমন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এবং ইসলামে অবৈধ একটা কাজ, তেমনি অধিক পরিমাণ দেনমোহর ধার্য করাও পুরুষদের জন্য একপ্রকার মানসিক চাপ ও জুলুম।

এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) এক হাদিসে শরিয়তের মূলনীতিরূপে বলেছেন, ‘সাবধান, জুলুম করো না। মনে রেখো, কারও পক্ষে অন্যের সম্পদ তার আন্তরিক তুষ্টি ব্যতীত গ্রহণ করা হালাল হবে না। (মিশকাত/২৪৫)।

দেনমোহর স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীর একটি বিশেষ অধিকার। সাধারণত বর ও কনের সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী দেনমোহর নির্ধারিত হয়। মুসলিম বিয়েতে এটি একটি বাধ্যতামূলক শর্ত। দেনমোহর আদায় করা ফরজ। কেননা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা মোহর আদায়ের আদেশ করেছেন। সুতরাং স্বামীর কর্তব্য যথাযথভাবে মোহর পরিশোধ করা। দেনমোহর যদিও একটি মধুর লেনদেন এবং ওইভাবেই তা আদায় করা উচিত, তবে তা নিছক উপহার নয় যে, ইচ্ছা হলে দেওয়া যায়, ইচ্ছে হলে বিরত থাকা যায়; বরং তা হল স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার। স্ত্রী যেমন প্রীতি ও ভালবাসার সঙ্গে নিজেকে অর্পণ করেছে, স্বামীরও কর্তব্য সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে তার মোহর আদায় করা। অতএব, মোহরের ওপর নারীর অধিকার সাব্যস্ত হওয়ার পর তা পরিশোধ না করা, কিংবা অন্যায়ভাবে ফেরত নেওয়া সম্পূর্ণ অবৈধ ও হারাম।

তবে স্ত্রী যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে মোহরের কিছু অংশ ছেড়ে দেয় কিংবা গ্রহণ করার পর স্বামীকে উপহার দেয় তাহলে স্বামী তা স্বচ্ছন্দ্যে ভোগ করতে পারবে। পূর্ণ মোহর ছেড়ে দেওয়ার বা পূর্ণ মোহর স্বামীকে উপহার দেওয়ারও অধিকার স্ত্রীর রয়েছে।

লেখক: কলামিস্ট, কবি ও আইন গবেষক

আপনার মতামত লিখুন :

দেনমোহর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতা

দেনমোহর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতা

তালাক, হিল্লা বিবাহ আইন, সামাজিক প্রথা ও কঠিন বাস্তবতা

তালাক, হিল্লা বিবাহ আইন, সামাজিক প্রথা ও কঠিন বাস্তবতা

দেওয়ানী মামলা কেন, কখন, কিভাবে করতে হয়?

দেওয়ানী মামলা কেন, কখন, কিভাবে করতে হয়?

হিন্দু বিবাহ রেজিষ্ট্রি না করার ফলাফল ও প্রাসঙ্গিকতা

হিন্দু বিবাহ রেজিষ্ট্রি না করার ফলাফল ও প্রাসঙ্গিকতা

পরকীয়া, নৈতিক অবক্ষয় ও আমাদের করণীয়

পরকীয়া, নৈতিক অবক্ষয় ও আমাদের করণীয়

শ্রমবান্ধব পরিবেশ এবং শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হতে হবে

শ্রমবান্ধব পরিবেশ এবং শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হতে হবে

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার: ApsNews24.Com (২০১২-২০২০)

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ নুরুন্নবী চৌধুরী সবুজ
01774-140422

editor@apsnews24.com, info@apsnews24.com
Developed By Feroj