ভয়াবহ বন্যায় ভাসছে সিলেট-সুনামগঞ্জ। রেলওয়ে স্টেশন বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাসাবাড়ি অফিস আদালত বিমানবন্দর সর্বত্র শুধু পানি আর পানি। ৬০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি। বলা হচ্ছে সিলেট-সুনামগঞ্জে ১২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বন্যা এটি। কী কারণে এমন ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হলো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না মানুষ। পরিবেশ সংগঠকেরা বলছেন, সিলেটের প্রতিটি নদ-নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে নাব্য হারিয়েছে। হাওরে অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ, রাস্তা ও স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে। নির্বিচারে কাটা হচ্ছে পাহাড়-টিলা। মূলত, ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির জন্য মোটাদাগে এসব কারণই প্রধানত দায়ী। ইতোমধ্যে এই অঞ্চলের নদ-নদী, খাল বিল, হাওর বাওর, ছড়া খাল ও জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে গেছে। তাদের মতে এসব নদ-নদী হারিয়ে ফেলছে স্বভাবিক পানি ধারণের ক্ষমতা। যে কারণে একটু বৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলের পানি নামলেই হচ্ছে ভয়াবহ বন্যা।
সিলেট অঞ্চলের চলমান ভয়াবহ দূর্যোগের এটাও অন্যতম একটি কারণ বলে মনে করেন পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীসহ বিশেষজ্ঞ মহল। তাদের এই মতের সঙ্গে একমত নদী রক্ষা কমিশনও। উভয়পক্ষ মনে করে, নদ-নদী, খাল বিল, ছড়া ও জলাশয় উদ্ধার, নদীনালা দখল ও দূষণমুক্ত করে খনন করলে সিলেট অঞ্চলে বন্যার ভয়াবহতা কিছুটা কমতে পারে। তবে ভারতের চেরাপুঞ্জি ও আসামে ১২২ বছরের রেকর্ড বৃষ্টিপাতকে দায়ী করছেন অনেকে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, সুরমা কুশিয়ারা, মনু, ধলাই, খোয়াই, সারি গোয়াইন, পিয়াইন, জূড়ী, কন্টিনালা ফানাইসহ সিলেট অঞ্চলে নদনদীর সংখ্যা অর্ধশতাধিক। আছে হাকালুকি, হাইলহাওর, কাউয়াদিঘী, টাংগুয়ার হাওরসহ আরও ৩ শতাধিক খাল বিল ছড়া হাওর বাওর জলাশয়। এগুলোর বেশিরভাগের এখন তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’ র মৌলভীবাজার জেলা সমন্বয়কারী আ স ম সালেহ সোহেল এ প্রসঙ্গে ঢাকা টাইমসকে বলেন, আমাদের নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর-বাওর, জলাশয়গুলো এক সময় প্রচুর পানি ধারণ করতে পারতো। কিন্তু অব্যাহত দখল ও দূষণ আর অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে এগুলো এখন পানি ধারণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। যে কারণে উজানে একটু বৃষ্টি হলেই হচ্ছে বন্যা। সিলেট অঞ্চলে আজকের এই দূর্যোগ তারই ফলাফল।
বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম মৌলভীবাজার জেলা সভাপতি নুরুল মোয়াইমিন মিল্টন ঢাকা টাইমসকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি বালু-মাটি-পলি জমতে জমতে নদ-নদীগুলো প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। পাশাপাশি রয়েছে নদী-বিধ্বংসী বিভিন্ন কর্মকাণ্ড। যত্রতত্র স্লুইসগেট ও অবকাঠামো নির্মাণের কারণেও নদীর প্রবাহপথ আরও বেশি সংকুচিত হয়েছে। এতে এবার অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে পানি জমে বন্যার সৃষ্টি করেছে। এ রকম পরিস্থিতি থেকে বাঁচার জন্য সিলেটের নদ-নদীগুলোর নাব্যতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। নদী দখলমুক্ত করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড.মঞ্জুর আলম চৌধুরী ঢাকা টাইমসকে বলেন,দখল ও ভরাটের কারণে সিলেট অঞ্চলের অনেক নদী তালিকা থেকে হারিয়ে গেছে। আবার যেগুলো আছে সেইসব নদ-নদী ও হাওরের তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। এই ভরাটের আবার বড় কারণ অপরিকল্পিত উন্নয়ন। বিশেষ করে প্রতি বছর এসব নদ-নদীতে বাঁধ নির্মাণ এবং ভারতীয় অংশে টিলা ও পাহাড় কাটা হয় ।
এছাড়া হাওরে একের পরে এক বাঁধ নির্মাণ করে পানির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করা হচ্ছে। যে কারণে ভারতীয় অংশে একটু বৃষ্টিপাত হলেই এসব নদ-নদী ও হাওর ফুলে ফেঁপে উঠছে।নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. চৌধুরী মনে করেন, ভরাট হয়ে যাওয়া এসব নদনদী দ্রুত ড্রেজিং করা জরুরি। পাশাপাশি নদ-নদীর অপরিকল্পিত উন্নয়ন বন্ধ করতে হবে। এছাড়া দখল হয়ে যাওয়া নদ নদী ও খাল বিল উদ্ধার করে পানির স্বভাবিক প্রবাহ সৃষ্টি করতে হবে। নদী রক্ষা কমিশনও সেই লক্ষে কাজ করছে।