জিসান তাসফিক:
পরকীয়া একটি অতিপরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত শব্দ। পরকীয়া সামাজিক ব্যাধি। আইনত অপরাধও বটে। পক্ষান্তরে বিবাহ একটি পারিবারিক বন্ধন। নর-নারী একে অপরের মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবার, ধর্ম ও আইনত স্বীকৃতির মাধ্যমে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। যুগ যুগ ব্যাপি এই প্রচলিত রীতিনীতি আমাদের সমাজে চলে আসছে। কিন্তু যখন এই বন্ধনে তৃতীয় কেউ এসে পরে তখনই সমস্যার গোড়াপত্তন হয়। এখানেই পরকিয়ার সূত্রপাত।
অনেকে মনে করে এটা একটি প্রেম, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি তৈরি হলে অন্যকেউ স্বামী অথবা স্ত্রীর কাছে এসে তার সাথে সম্পর্কে জরিয়ে পরে। আর এটাকে তারা প্রেম বলে। আমি এর কোনো ব্যাখ্যা দিব না কি ফলাফল দিতেছি। এর ফলে বিবাহ বিচ্ছেদ হয় , খুন হয়। বর্তমানে সমাজে এটা একটি দৈনন্দিন ঘটনা । সাম্প্রতিক বহুল আলোচিত বরগুনা রিফাত হত্যাকাণ্ড। সেখানে মিন্নি ও নয়ন বন্ডের পরোকিয়া প্রেমের ফলে যা হয়েছে তা সকলের অবগত। বাংলাদেশ দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ৩০২ ধারা অনুযায়ী হত্যা কান্ডের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।
বাংলাদেশে অপরাধ পরিসংখ্যান বলে, ২০১৯ সালের বিগত ৬ মাসে অর্থাৎ ১৮০ দিনে ৪ হাজার ৫৫৭টি তালাকের আবেদন হলে একদিনে আবেদন হয়েছে ২৬টি তালাকের। অর্থাৎ প্রতি ৫৫ মিনিটে একটি সংসার ভাঙার আবেদন জমা পড়েছে নগর ভবনে।স্বামীর পরকীয়া, মাদকাসক্ত এসব গুরুতর কারণে যেমন তালাক হয়, আবার স্ত্রীর নানা দোষ দেখিয়েও স্বামীরা তালাকের আবেদন করে। আর প্রতিদিনই খবরের পাতার শিরোনামে পাওয়া যায় পরকীয়ার ফলে হত্যা কান্ড। চট্টগ্রামে বিখ্যাত আত্মহত্যা খবর, যেখানে ডা. আকাশ তার স্ত্রীর পরকীয়া প্রেমের কারণে আত্মহত্যা করে।
একটি নতুন পরিবার থেকে নতুন জীবনের আবির্ভাব হয়, সেই নতুন জীবনের শিক্ষা-দীক্ষা সব কিছুই ঐ পরিবার থেকে আসে। কিন্তু কোনো কারণে যদি ঐ পরিবার ধংস হয়ে যায় তবে নতুন জীবন তথা আগামী ভবিষ্যতের কি হবে ? আমরা এখন সচেতন না হলে সমাজ ধংসের মুখে গেল বলে।
আইন আদালত হয়েছে ন্যায়ের জন্য, অপরাধী তার অপরাধে উপযুক্ত শাস্তি পায় এবং সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন হয় তার জন্যই আইন। কিন্তু কথা হল যদি এমন ঘটনা আপনার জীবনে ঘটে তাহলে আপনি কি করবেন? আইনী সাহায্য ও সহযোগিতা কি পাবেন?
আপনার কাছে যদি মনে হয় আপনার বিবাহিত জীবন সাথী পরকীয়া আসক্ত তবে আপনি আইনী প্রতিকারের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে পারবেন। পরকীয়াকে দন্ডবিধি ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গন্য করা হয়েছে। পেনাল কোড ১৮৬০ এর ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী অনুযায়ী পরোকিয়া একটি ব্যভিচার এবং যে ব্যক্তি কোনো বিবাহিত স্ত্রীর সাথে (স্বামী এর সম্মতিতে নয়) সহবাসে লিপ্ত হবে তবে উক্ত ব্যক্তিকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অর্থ দন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। কিংবা এরূপ কাজে প্ররোচিত করলে সেক্ষেত্রে ৪৯৮ ধারা অনুযায়ী দোষী ব্যক্তিকে ২ বছরের কারাদণ্ড বা অর্থ দন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা হবে।
দন্ডবিধিতে স্ত্রী লোককে এরূপ কাজে কোনো দোষারোপ করা হয়নি। বাংলাদেশের সংবিধানে নারী ও পুরুষের জন্য ১৯,২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদে সমান অধিকার, সমান মর্যাদা ও সমান সুযোগ লাভের কথা বলা হয়ে থাকলেও এই অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন দন্ডবিধি ৪৯৭ ও ৪৯৮ ধারাতে প্রয়োগ পেলাম না। ইসলামে নিয়মে উভয়ই অপরাধী ও উভয়ই শাস্তি লাভ করবে। অন্যান্য ধর্মেরও পাপ।
কিন্তু তাই বলে এরূপ কাজের জন্য কোনো স্ত্রীলোক বেচে যাবে তা কিন্তু নয়। বাংলাদেশে চুক্তি আইন অনুযায়ী বিবাহ বন্ধনও একটি চুক্তি (মুসলিম বিবাহ)। চুক্তি লঙ্ঘন করা আইনত অপরাধ (দন্ডনীয় নয়)। এরূপ কাজের জন্য আপনি চাইলে আদালতে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ মামলা করতে পারবেন। এটির মামলা পারিবারিক আদালতে হয় (পারিবারিক আদালত আইন, ১৯৮৫)। আবার চাইলে তালাকে জন্য ও মামলা করতে পারেন। এটি স্বামী, স্ত্রী উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
এছাড়াও মুসলিম বিবাহ আইনগুলোতে আপনি বিস্তারিত পাবেন। হিন্দু বা অন্য ধর্মগ্রন্থের বিবাহ আইনে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রতিকার নেই কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য আদালতের দারস্থ হওয়া যাবে। কারণ কোনো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য আদালতে ন্যায়বিচার হবেই। তবে আপনার স্বামী কিংবা আপনার স্ত্রী এরূপ কাজে জরিত থাকে তবে সর্বাপেক্ষা উত্তম হল নিকটস্থ কোনো বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া। একটি কথা মনে রাখবেন আইন ও ন্যায় দুটোই আপনার নাগরিক অধিকার। আর পরিবারকে নিয়মিত সময় দিবেন, ভালোবাসুন, সুখী ও দাম্পত্য জীবন গড়ুন। শান্তিই জীবনের সমৃদ্ধি।
লেখক: জিসান তাসফিক
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ,
বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।