মৈত্রী মিলনায়তন, মুক্তিভবন, পুরানা পল্টন,ঢাকা-১০০০ এ আইনজীবী অন্তর্ভুক্তিকরণ পদ্ধতি সংস্কারের দাবীতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বিশেষ সময়ের দাবী অনুযায়ী তাদের এই সম্মেলনের বক্তব্য তাদের ভাষায় তুলে ধরা হলো:
একটি বিশেষ সংকট,সংকট মোচনের উপায় ও আন্দোলন প্রসঙ্গে আপনাদের মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষ ও দেশবাসীকে অবহিত করতে আজকের এই সংবাদ সম্মেলন আমরা আয়োজন করেছি।
সুদীর্ঘকাল ধরে আইন পেশা সমাজের কাছে অত্যন্ত সম্মানজনক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। জনজীবনের নানা সংকটে ন্যায়বিচার পেতে মানুষ আদালতের শরণাপন্ন হন। বাদী এবং বিবাদী পক্ষের আইনজীবীগণ তাদের মেধা ও প্রজ্ঞা কাজে লাগিয়ে যুক্তি-তর্কের ভিত্তিতে ঘটনার সত্যাসত্য নির্ণয়ে ভূমিকা রাখেন,যার ভিত্তিতে বিজ্ঞ আদালত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সংকট নিরসন করেন। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবীদের অভিভাবক হিসেবে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কাজ করে আসছে।
একটি সেবামূলক বৃত্তি হিসেবে ন্যায়পরায়ণতা ও মানবাধিকার সংরক্ষণে নিজেদের যুক্ত করতে অসংখ্য তরুণ নিজেদের আইনজীবী হিসেবে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন। আমাদের দেশে চলমান পদ্ধতি অনুযায়ী একজন আইনের ছাত্র বিশ^বিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক বা এলএলবি (সম্মান) অথবা এলএলবি (পাস) উত্তীর্ণ হওয়ার পরপরই আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে পারেন না। তাকে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অধীনে আবার তিন ধাপের পরীক্ষা উত্তীর্ণ হওয়ার পর আইনজীবী সনদ দেয়া হয়। কখনো-কখনো এ তিন ধাপের পরীক্ষা একবার সম্পন্ন হতে তিন-চার বছর সময় লেগে যায়। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশ বেকারত্ব বৃদ্ধির হারে বিশে^ শীর্ষের তালিকায় অবস্থান করছে। সেইসঙ্গে অধিকাংশ তরুণের আর্থ-সামাজিক অবস্থা এমন নয় যে স্নাতক বা ¯স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পরও ৩-৪ বছর বা আরো বেশি সময় উপার্জনহীন অথবা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পিছে ছুটতে পারবেন। ফলে দেখা যায় যে আইনে স্নাতকদের শতকরা আশি জনেরও বেশি আইন সম্পর্কিত পেশায় যুক্ত হতে পারছেন না। এ প্রেক্ষিতে আইন পেশার বাইরে অন্য কোন পেশা বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে জনগণ একদল চৌকস,স্বপ্নবান,মেধাবী তরুণের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
স্নাতক পর্যায়ে আইনশাস্ত্রের বিভিন্ন শাখা কোর্স হিসেবে পড়ানো হয়। কোন কোন বিষয় পড়া প্রয়োজন তা বিবেচনা করেই পাঠ্যসূচি নির্ধারিত হওয়ার কথা। এসব বিষয় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও পেশা প্রবেশের পথে আবার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। অথচ আইনজীবী কোন বেতনভুক্ত চাকুরে নন। এটি একটি অসঙ্গতি হিসেবে প্রতীয়মান হয়। আইনে স্নাতক সম্পন্ন করাটাই আইনজীবী হওয়ার যোগ্যতা নির্দেশক। ¯œাতক ডিগ্রি যদি যোগ্যতার পরিচায়ক না হয় তবে বিষয়টি বিশ^বিদ্যালয় ও তার শিক্ষাপদ্ধতিকে হেয় প্রতিপন্ন করে অথবা ত্রুটি নির্দেশ করে। আইন শিক্ষায় ত্রুটি থাকলে পাঠ্যসূচি ও পঠন-পাঠন পদ্ধতি সংস্কার করে ত্রুটি দূর করার প্রয়োজন নির্দেশ করে। ইতিপূর্বে আইনজীবী অন্তর্ভুক্তকরণ পরীক্ষা নিয়ে অনিয়মের বহু অভিযোগ উঠেছে। সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও আস্থার প্রতিক প্রতিষ্ঠান বাংলদেশ বার কাউন্সিলের ভাবমূর্তিকেও যা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। অথচ সহজেই বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের মত সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান এসব বিতর্ক এড়িয়ে চলতে পারত। প্রতি বছর দুইবার প্রচলিত পদ্ধতিতে পরীক্ষা হওয়ার নিয়মনীতি থাকলেও কর্তৃপক্ষ আযোজন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ভুলনীতির মাধ্যমে আইনজীবী অন্তর্ভুক্তিকরণ পদ্ধতি বাতিলের বিকল্প নেই।
আবার এ পরীক্ষা,উত্তীর্ণদের পেশাজীবনে কোন কার্যকর প্রভাব রাখতে পারে না। বরং বিকল্প উপায়ে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সনদ প্রদান করা সম্ভব ছিল। শিক্ষানবিশকালে প্রশিক্ষণ কর্মশালা,সেমিনার-সিম্পোজিয়াম ও অ্যাসাইনমেন্টের আয়োজনের মাধ্যমে সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে অধিক সহায়ক বলে আমাদের কাছে বিবেচিত।
আমরা দেখতে পায়,চিকিৎসাও এমন সেবামূলক পেশা,যাদের হাতে মানুষের বাঁচা-মরা সবসময় নির্ভর করে। সেক্ষেত্রে কেউ এমবিবিএস পাশ করার পর নির্দিষ্ট মেয়াদের শিক্ষানবিশকাল শেষে বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যান্ড ডেন্টাল এ্যাসোসিয়েশনের ফরম পূরণ সাপেক্ষে ব্যক্তিগতভাবে পেশা জীবনে প্রবেশ করতে পারে। একই কথা খাটে স্থপতি ও প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রেও।
আবার যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্য,ফ্রান্স,ইতালিসহ প্রভৃতি দেশের প্রথিতযশা আদালতেও এরূপ পরীক্ষা পদ্ধতির অস্তিত্ব নেই। ভারতসহ পাশর্^বর্তী দেশসমূহের পদ্ধতিও আমাদের তুলনায় সরল। ১৯৮১ সালের আগে আমাদের দেশেও এরূপ পরীক্ষা ছিলনা। ২০১২ সালের আগে চলমান তিন ধাপের পরীক্ষা পদ্ধতি ছিলনা। পরীক্ষাহীন পদ্ধতিতে সনদ পেয়েও তৎকালীন আইনজীবীদের অধিকাংশই নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে আদালত ও বিচার ব্যবস্থার মুখ উজ্জ্বল করেছেন।
মামলাজট নিরসন ও বিচারিক ব্যবস্থার সেবা জনগণের নাগালে নিতে উপজেলা পর্যন্ত আদালত সম্প্রসারণ,এমনকি গ্রাম আদালতে বিচারক,আইনজীবী,কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করার মাধ্যমে আইন সংশ্লিষ্ট পেশায় অধিক সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব। বিভিন্ন দেশে কোর্ট লয়্যার ও অ্যাডভাইজার লয়্যার পৃথকভাবে কর্মকা- পরিচালনা করেন। এ অভিজ্ঞতা আমাদের দেশে প্রয়োগ করা যেতে পারে যা বিশেষায়িত কর্মক্ষেত্র হিসেবে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। এসব উদ্যোগে অনেকগুলি সংকট সমাধান করা সম্ভব।
এসব বিবেচনা থেকে আইন ¯œাতকদের ভোগান্তি দূর করে পেশাজীবনে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে একটা কার্যকর গণ আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে গত ১৩ আগস্ট,২০২০,ঝিনাইদহ আইনজীবী সমিতি ভবনের হলরুমে আইনজীবী,শিক্ষানবিশ আইনজীবী ও আইন শিক্ষার্থীদের এক সভা থেকে আইনজীবী সনদ অধিকার আন্দোলন নামক প্লাটফর্ম গড়ে তোলা হয়। পরবর্তীতে ৪ দফা দাবিনামা প্রণয়ন করে দাবি আদায়ে ১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস থেকে ১৭ অক্টোবর, ২০২০ দাবি মাস পালনের মধ্য দিয়ে মাসব্যাপী গণস্বাক্ষর সংগ্রহ শেষে গত ১৮ অক্টোবর,২০২০ ‘দাবি দিবস’ পালনের অংশ হিসেবে সারাদেশ থেকে ডাকযোগে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল সচিব বরাবর স্মারকলিপি পেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। মাসব্যাপী প্রচার-প্রচারণা, সভা-সমাবেশ, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি শেষে গত ১৮ অক্টোবর ঢাকা, খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, রাজশাহী, নড়াইল, কুষ্টিয়া, ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়, ময়মনসিংহ, যশোর, রাজবাড়ী, বরিশাল, নাটোর, সিলেট ও খাগড়াছড়িসহ বিভিন্ন জেলায় দাবি দিবসের কর্মসূচি পালিত হয়।
আমাদের দাবিনামা:
জটিল,সময়সাপেক্ষ ও হয়রানিমূলক তিন ধাপের পরীক্ষা নামক ছাঁটাই প্রক্রিয়া বাতিল কর। উপজেলায় আদালত চালু কর,গ্রাম আদালত পর্যন্ত বিচারক নিয়োগ ও আইনজীবীদের কার্যক্রম বিস্তৃত কর।
আইন ¯œাতকদের শিক্ষানবিশকাল এক বছর কর। শিক্ষানবিশকালে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ কর্মশালা,সেমিনার ও অ্যাসাইনমেন্টের আয়োজনের মাধ্যমে সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন কর। নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মশালা-সেমিনার-প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ ও অ্যাসাইনমেন্ট প্রদান সাপেক্ষে আইনজীবী সনদ প্রদান কর।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও বাংলাদেশ বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সমন্বয় সভার মাধ্যমে নির্দিষ্ট মেয়াদে আইনে ¯œাতক পর্যায়ে কাম্য ছাত্র সংখ্যা নির্ধারণ কর অথবা বিশেষ প্রতিষ্ঠান গঠন করে আইনের ছাত্র সংখ্যা,সিলেবাস ও পেশাগত সংকট সমাধানে সমন্বয়ের ব্যবস্থা কর।
বিজ্ঞ আদালতে মামলা পরিচালনায় নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত শিক্ষানবিশ আইনজীবীর অংশগ্রহণের ব্যবস্থা কর। বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে অন্তর্ভুক্তিকরণের পূর্ব পর্যন্ত ন্যূনতম শিক্ষানবিশ সম্মানী ফি নির্ধারণ কর ও সংশ্লিষ্ট আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে প্রাপ্তি নিশ্চিত কর।
উপযুক্ত দাবি আদায়ে আমরা পরবর্তী দুই মাসের কর্মসূচি ঘোষণা করছি। আমাদের কর্মসূচি নি¤œরূপ:
নভেম্বর,২০২০:
দাবি পক্ষ: ১ নভেম্বর থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত দাবি পক্ষ পালিত হবে। দাবিনামা পরিচিতকরণ ও জনপ্রিয়করণের উদ্দেশ্যে পক্ষজুড়ে দেশব্যাপী সভা,সেমিনার,সিম্পোজিয়াম,মতবিনিময়,গোলটেবিল বৈঠক,মানববন্ধন,অবস্থান ও সমাবেশ পালিত হবে। এসব কর্মসূচিতে আইনজীবী,শিক্ষানবিশ আইনজীবী,আইনজীবী সহকারী,আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইন শিক্ষক, আইন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ছাত্র-যুব সংগঠক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক, গণমাধ্যমকর্মীসহ সুধীজনদের যুক্ত করার প্রচেষ্টা থাকবে।
০১ নভেম্বর : আইনজীবী সনদ অধিকার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল মাননীয় এ্যাটর্নী জেনারেল ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের সাথে দেখা করে ৪ দফা দাবি বাস্তবায়নে স্মারকলিপি পেশ করবেন।
সাংগঠনিক পক্ষ: ১৬ নভেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর সাংগঠনিক পক্ষ পালিত হবে। এ পক্ষে সাংগঠনিক যোগাযোগ বৃদ্ধি ও সংহতকরণ,কমিটি গঠন,কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সফর সম্পন্ন করা হবে।
ডিসেম্বর,২০২০:জেলা,কলেজ ও বিশ^বিদ্যালয়ে গোলটেবিল ও মতবিনিময় সভা আয়োজিত হবে। করোনামহামারি পরিস্থিতির তাৎপর্যপূর্ণ উন্নতি হলে ২৬ ডিসেম্বর,২০২০ ঢাকায় আইনজীবী সনদ অধিকার কনভেনশন অনুষ্ঠিত হবে। অন্যথায় একই দিনে আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, প্রগতিশীল আইনজীবী সংগঠন, প্রগতিশীল ছাত্র-যুবও সাংস্কৃতিক সংগঠনের অংশগ্রহণে জাতীয় গোলটেবিল বৈঠক আয়োজিত হবে।
গণমাধ্যমকর্মী বন্ধু,
বিভিন্ন সময়ে জনগুরুত্বপূর্ণইস্যুতে আন্দোলন গড়ে উঠলে সংকটের স্বরূপ উদ্ঘাটনের প্রয়োজনে ভূক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা এবং লড়াইয়ের কথা আপনাদের মাধ্যমেই আপামর জনগণ অবগত হয়। জনগণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের জীবন-জীবিকা-মর্যাদা ও সর্বসাধারণের অত্যাবশকীয় সেবা সংক্রান্ত আলোচ্য বিষয়টি ও আমাদের চলমান আন্দোলন কর্মসূচিও যথাযোগ্য মর্যাদা দাবি করে। অতীতের বিভিন্ন সময়ের মত চলমান আন্দোলনের বক্তব্য প্রচারেও আপনাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা আমরা প্রত্যাশা করি।
গভীর দুঃসময়ে এখানে এসে দীর্ঘক্ষণ ধরে আমাদের বক্তব্য শোনা ও আলোচনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে আজকের সংবাদ সম্মেলন সাফল্যম-িত করে তোলায় আপনাদের অন্তরিকভাবে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। একইসাথে আইন পেশার সংকট নিরসন ও সেবার মান উন্নতকরণে তারুণ্যের স্বপ্ন বাঁচাতে আইন শিক্ষার্থী, শিক্ষানবিশ আইনজীবী, আইন শিক্ষক, বিজ্ঞ আইনজীবী, অভিভাবক, সাংবাদিক, সচেতন নাগরিক ও সুধিজনের অংশগ্রহণে আমাদের উত্থাপিত ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবি আদায়ে কার্যকর গণআন্দোলন গড়ে তোলার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।


