সব
facebook apsnews24.com
শিক্ষাদান নাকি শিক্ষা বিপণন? - APSNews24.Com

শিক্ষাদান নাকি শিক্ষা বিপণন?

শিক্ষাদান নাকি শিক্ষা বিপণন?

আরিফুল ইসলাম

শিক্ষার লক্ষ্য নিয়ে প্রাচীন গ্রীসে তিন ধরণের মতবাদ দেখা যেত। এক ঘরানার দার্শনিকগণ মনে করতেন, শিক্ষার লক্ষ্য অর্থ উপার্জন নয় এর লক্ষ্য হলো শুধুই জ্ঞান অর্জন। তাই অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা গ্রহণ বাঞ্ছনীয় নয়।
আরেক ঘরানার দার্শনিকগণ মনে করতেন যে, বিদ্যা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত আয় বাড়িয়ে দেয়; কাজেই অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা দেয়া ন্যায়সঙ্গত।
তৃতীয় মতবাদের প্রবক্তারা মনে করতেন যে,বিদ্যার জন্য অর্থের প্রয়োজন রয়েছে তবে বিদ্যাকে অর্থের দাসে পরিণত করা ন্যায়সঙ্গত হবে না।
প্রথম মতবাদের প্রবক্তা ছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস। সক্রেটিসের মতে, শিক্ষার মূল লক্ষ্য অাত্নার বিকাশ, অর্থ উপার্জন নয়।তিনি বিশ্বাস করতেন অর্থের বিনিময়ে বিদ্যা বিক্রয় পাপের কাজ।
যদি কোনো ব্যক্তি তার দৈহিক সৌন্দর্যকে অর্থের বিনিময় ক্রয়োচ্ছু কোনো ব্যক্তির কাছে বিক্রয় করে, সমাজ তাকে দেহব্যবসায়ী আখ্যা দেয়।একইভাবে যারা তাদের জ্ঞান অর্থের বিনিময়ে ইচ্ছুক ক্রেতাদের কাছে বিক্রয় করে থাকেন তাদেরকে লোকেরা সোফিস্ট বলে। তারা হচ্ছেন জ্ঞান জগতের গণিকা। সক্রেটিসের মতে, যেসব শিক্ষক অর্থ উপার্জনের জন্য পড়িয়ে থাকেন তারা জ্ঞান জগতের বারবনিতা। শিক্ষার উদ্দেশ্য অর্থ উপার্জন নয়। তাই তার মতে, পন্ডিতদের জীবনে দারিদ্র্য হলো অত্যন্ত প্রত্যাশিত। দার্শনিক এন্টিফেনিস ছেড়া কাপড় পড়তেন। তাই সক্রেটিস তাকে বলতেন, এন্টিফেনিসের পোশাকের প্রতিটি ছিদ্রে তার দম্ভ দেখা যায়।
সক্রেটিসের মতবাদের বিরোধী মতবাদ দাড় করেছিলেন সোফিস্ট ঘরানার দার্শনিক প্রেটাগোরাস। তিনি বিদ্যার্থীদের শিক্ষা দিয়ে অত্যন্ত চড়া মজুরি দাবি করতেন। শিক্ষার্থী প্রতি তিনি দশ হাজার দ্রাকমা (একধরনের রৌপ্যমুদ্রা) আদায় করতেন। যার বর্তমান বাজারমূল্য ত্রিশ হাজার ডলারের চেয়েও অধিক। পড়ানোর জন্য এত চড়া মূল্য আদায় করাকে প্রেটাগোরাস কোনো অন্যায় মনে করতেন না। প্রডিকাস, হিপ্পিয়াস,এবং জর্জিয়াস প্রেটাগোরাসের সমকালীন এবং সমগোত্রীয় ছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের শেষ দিকে এরা জনপ্রিয়তা লাভ করলেও পরবর্তীকালে সক্রেটিস ও প্লেটো কর্তৃক এদের চিন্তা-দর্শন ব্যাপক ভাবে সমালোচিত হয়। জ্ঞান জগতের মহান শিক্ষক সক্রেটিস এদেরকেই বলেছেন শিক্ষা জগতের বেষ্যা।
তবে মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছেন তৃতীয় মতবাদের প্রবক্তা এরিস্টিপাস। তারমতে, শিক্ষাদানের বিনিময়ে অর্থ নেয়া যাবে তবে প্রয়োজনের অধিক না।
প্রেটাগোরাস কিংবা হিপ্পিয়াস পড়লোকে গিয়েছেন অাড়াই হাজার বছর পূর্বে; যখন মানব ইতিহাসের অন্ধকার যুগ। তবে, হাজার বছর পরেও অন্ধকারের রেশ কাটেনি। হালের শিক্ষা ব্যবস্থায় অর্থ-ই বিদ্যার মূলমন্ত্র। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা সর্বত্র-ই অর্থের ছড়াছড়ি। বিদ্যার্জন অর্থ উপার্জনে বিনিয়োগ মাত্র।
শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক থেকে শুরু হয় কোচিং কেন্দ্রিক পড়াশোনা। যার চূড়ান্ত রুপ নেয় মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে। শিক্ষক মহোদয়গণ দায় সারেন শ্রেণিকক্ষে , পড়ান কোচিং কক্ষে। পড়ানোর বিনিময়ে আদায় করেন মোটা অঙ্কের অর্থ, যা প্রদানে অনর্থ ঘটে অনেক শিক্ষার্থীর-ই। শিক্ষাদানের চেয়ে কাঁচা টাকার নেশায়-ই বেশি মত্ত এই অসাধু শিক্ষকগণ। কোচিংএ না পড়ায় অকৃতকার্য হয়েছে শিক্ষার্থী এমন ঘটনাও ঘটছে হররোজ। শুধু কোচিং বাণিজ্যের কারণে শিক্ষা ব্যয় বেড়েছে বহুগুন। শিক্ষার্থী আর অবিভাবকের নাভিশ্বাস উঠছে। অবিভাবকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১২ সালে এবিষয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করে সরকার।তবে তদারকির অভাবে কাগজ-কলমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এ আইন। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট এ নীতিমালার বৈধতা দিলে ফের আলোচনায় অাসে এ বিষয়টি। তবে কফিনের শেষ পেরেক ঠুকে দেয়া হয় চলতি বছরে বাণিজ্যিক কোচিং সেন্টারের বৈধতা প্রদান করে। কিছু নীতিমালা বলবৎ থাকলেও তদারকির লেশমাত্র নেই। করোনা মহামারীর ভ্যাকসিন বের হবে, বিলুপ্তিও হবে হয়তো তবে কোচিং মহামারীর কোনো প্রতিষেধক কি আদতে হবে?
মাধ্যমিকের গন্ডি পাড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেউরিতে পা রেখে হাফ ছেড়ে বাচে শিক্ষার্থীরা। পেছনের কথা ঘুনাক্ষরেও ভাবতে চায়না তারা। সময় এখন ছুটে চলার। তবে এই ছুটে চলাকে বাধাগ্রস্ত করে সেশন ফী, ভর্তি ফী, উন্নয়ন ফী নামক ফীসমগ্র। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিছুটা সাশ্রয় থাকলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে গুণতে হয় চড়া মূল্য।
প্রচলিত কথাবার্তায় আমরা প্রায়শই ‘শিক্ষাদান’ নামক বুলিটি আওড়িয়ে থাকি তবে বর্তমান সময়ে প্রত্যয়টি ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে গিয়েছে। শিক্ষা হয়েছে ব্যবসায়িক পণ্য আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবসাকেন্দ্র। যেখানে অর্থের বিনিময়ে ক্রয়-বিক্রয় হয় শিক্ষা নামক পণ্যটি। যার মূল্য হয়তো প্রেটাগোরাসের দশহাজার দ্রাকমাও ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাই ‘শিক্ষাদান’ এর পরিবর্তে ‘শিক্ষাবিক্রয়’ বা ‘শিক্ষবিপণন’ প্রত্যয়টি-ই যথাযোগ্য। তবে শিক্ষা কখনো-ই বিপণনযোগ্য পণ্য নয়। এর আশু সমাধান কাম্য।
আশাবাদ রাখতে চাই এ করোনা মহামারীর স্রোতে ধুয়ে-মুছে শুদ্ধ হয়ে যাবে জাতির মহান সন্তানদের মানসিকতা। দূর হয়ে যাবে হাজার বছর পূর্বের সোফিস্টদের কালোছায়া। থাকবে না শিক্ষাজগতের গণিকাবৃত্তি। শিক্ষা কিংবা শিক্ষক হবে না অর্থের দাস। বিদ্যা শিক্ষা করে শিক্ষার্থীদের ঐশ্বর্যের দাস হলে চলবে না,বরং ঐশ্বর্যেকে দাসে পরিণত করতে হবে।

লেখক : মো: আরিফুল ইসলাম।
শিক্ষার্থী,নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
০১৭৭৯৮১৮৯৯৯
[email protected]

  • 80
    Shares

আপনার মতামত লিখুন :

কমন ল এবং বাংলাদেশ

কমন ল এবং বাংলাদেশ

অভিভাবকের অসম্মতিতে প্রেমের বিয়ে, মামলা ও ফলাফল!

অভিভাবকের অসম্মতিতে প্রেমের বিয়ে, মামলা ও ফলাফল!

বিচারক ও আইনজীবী সুসম্পর্ক, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অন্যতম নিয়ামক

বিচারক ও আইনজীবী সুসম্পর্ক, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অন্যতম নিয়ামক

রাষ্ট্রের নেতা পরিবর্তন হয়, পররাষ্ট্র নীতি নয় !

রাষ্ট্রের নেতা পরিবর্তন হয়, পররাষ্ট্র নীতি নয় !

ফৌজদারী মামলায় সন্দেহের সুবিধা ও বাস্তবতা!

ফৌজদারী মামলায় সন্দেহের সুবিধা ও বাস্তবতা!

“মার্কিন নির্বাচন ২০২০ ও বিশ্বরাজনীতি”

“মার্কিন নির্বাচন ২০২০ ও বিশ্বরাজনীতি”

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার: ApsNews24.Com (২০১২-২০২০)

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ নুরুন্নবী চৌধুরী সবুজ
01774-140422
প্রকাশকঃ আইনী পাঠশালা গ্রুপ
২২ চ্যামেলীবাগ (সিআইডি অফিসের পাশে) রমনা থানা, ঢাকা-১০০০।
01625-461876, 01771-784299
[email protected], [email protected]
Developed By Feroj

ব্রেকিং নিউজ