তালহা জাহিদঃ – সবদিক থেকে মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হলেও প্রাণ হারানো বা মৃত্যু যন্ত্রণার দিক থেকে পশু আর মানুষ একই। একটা মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করলে মানুষটার যে কষ্ট হয়, একটা পশুরও তাই হয়। মৃত্যু বা ব্যথা পাওয়ার ভয় যেমন মানুষের আছে, তেমন পশুরও আছে। যেমন আমরা গরু, ছাগল ও ঘোড়া ইত্যাদি পালন করতে গিয়ে লাঠি, বেত কিংবা চাবুক ব্যবহার করে থাকি। এতে বুঝা যায়, ব্যথা বা আঘাতের অনুভূতিটা একটা মানুষ আর পশুর মধ্যে সমান। বর্তমানে বাংলাদেশে নৃশংসভাবে পশু হত্যার হার ব্যাপকভাবে বাড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই আমরা নির্মমভাবে পশু হত্যার খবর পাই, ভিডিও দেখি। কারণে অকারণে, জেনে না জেনে পশুর উপর বীভৎস নির্যাতনের দৃশ্য দেখছি প্রতিনিয়ত।
এব্যপারে আমি তালহা জাহিদ। দুঃখ নিয়ে আজ নিজের অভিজ্ঞতা বলছি, দির্ঘ ৬-৭ মাস আগে আমার বাড়িতে( পশ্চিম কেশবকাঠী শেখ বাড়ি, উজিরপুর, বরিশাল।) দুইটি কুকুর ছানা পালনের জন্য নিয়ে আসি, দেখতেও যেমন নামও রাখলাম তেমন, একটার নাম লাল ও অন্যটার কালা…। দেখতে দেখতে কুকুর দুটি বেশ বড় হয়ে উঠেছে, ওরা সঠিক ভাবে বাড়ি পাহাড়া সহ সর্বক্ষন তৎপর। আমি ও আমার মা’সহ আমার বাড়ির সবাই, এমনকি বাড়ির সামনে দোকানে সকলেই কুকুর দুটিকে খুব পছন্দ করতেন। কালা বাড়িতেই বেশি থাকে, আর লাল আমার সাথে সাথে বাড়ির সামনে দোকানে বেশি যেতো। কিন্তু গতকাল ২১ মার্চ রবিবার সকালে মা ডাক দিতেই ঘুম থেকে উঠে দেখলান, লাল(কুকুর) খুব অসুস্থ ওর চোখ থেকে পানি, মুখ থেকে লালা পরছে এবং শরীর কাপঁছিলো। সাথে স্থানীয় পশু ডাক্তার জামাল’কে ফোন করলাম, তাকে বাড়িতে আসতে বললে তিনি বললেন, তিনি কুকুরের চিকিৎসা জানেন না। তিনি সুধু গরু ছাগলের চিকিৎসা পারেন, তবে তিনি উপজেলা পশু হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ আবুল’র ফোন নাম্বার( ০১৭১৬৬৭৮২৯২) দিলেন, পরে৷ ডাঃ আবুল’র সাথে কথা বলেল লক্ষ্মণ শুনে বললেন এগুলো বিষক্রিয়ার কারনে হয়ে থাকে, স্থানীয় হারতা বাজার থেকে একটি ইনজেকশন (এ্যাট্রোপিন সাল্ফ ২) দিতে বললেন। লাল( কুকুর)’কে নিয়ে হারতা স্থানীয় ডাঃ নরেণ কাছে নিয়ে গেলে তিনি লক্ষ্মণ দেখে চিকিৎসা করে বললেন, বিষ হজম হয়ে গেছে, ওয়াশ করার সময় শেষ তাই এন্টিবায়োটিক’সহ বিষক্রিয়ার চিকিৎসা করেন। কিন্তু কুকুরটি বাচঁনো সম্ভব হয়নি, ফের বাড়িতে আসার ২-৩ ঘন্টা পরে কুুুুকুর দেহটি নিথর হয়ে মৃত্যু হয় ! আমার ও মায়ের চোখের পানি আটকানো গেলো না!
যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে এটা করে থাকে তবে বলবো, শত্রুতা হয়তো আমার বা পরিবারের সাথে থাকতে পারে কুকুরের সাথে কি? যে পশুর সাথে এমন নৃশংষতা! আমি জানি, আপনি এখন ভাবছেন, যে দেশে মানুষকেই নৃশংষভাবে হত্যা করার ঘটনা প্রচুর। অনেক ক্ষেত্রে এসব হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচারও হয় না। সে দেশে আবার পশু হত্যা নিয়ে কথা! আসলে মানুষ হত্যার সাথে পশু হত্যার একটি সূক্ষ্ম সম্পর্ক আছে। ব্যাপারটা তাহলে খুলে বলছি। ঠিক কী কারণে মানুষের ভেতরে জঙ্গলের জানোয়ারের মতো অদ্ভুত স্বভাব ঢুকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এই যেমন আমরা আগে শুনতাম গুলি করে হত্যা, মাথায় বাড়ি দিয়ে হত্যা, ছুরির আঘাতে হত্যা ইত্যাদি। কিন্তু হত্যার ধরণটা পাল্টে গেছে এখন। কেউ কাউকে হত্যা করতে গেলেও সাধারণ পন্থা ব্যবহার করছে না! এখন তাহলে আপনাকে একটা মজার তথ্য দেই। সাধারণত মানুষ নৃশংস ও বর্বর হয় প্রথমে পশুর উপর। এবং ধীরে ধীরে নৃশংসতটা তার মস্তিষ্কে বসে যায়, এভাবে তার মধ্যে চলে আসে নৃশংসতার অভ্যস্ততা। তারপর একটা দুইটা তিনটা করতে করতে ছোট ছোট অপরাধগুলো বড় বড় অপরাধের দিকে এগিয়ে যায়। পশু হত্যা থেকে হাত চলে আসে মানুষ হত্যার উপর। পশুর মৃত্যু যন্ত্রণা ছটফটানি দেখতে দেখতে মানুষের ওপর নির্যাতনের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই অভ্যস্ততা চলে আসে। এখন দৃষ্টি দেই আইনের দিকে। এ ব্যাপারে আইন কী বলে। ইংরেজদের আমলে বাস্তবায়ন করা ‘পশু নির্যাতন আইন-১৯২০’ এ উল্লেখ আছে, কেউ অপ্রয়োজনীয় নির্যাতনের দ্বারা পশু হত্যা করলে ‘পশু নির্যাতন আইন-১৯২০ ধারা ৭’ অনুযায়ী তার শাস্তি ২০০ (দুই শত) টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা ৬ (ছয়) মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবে। হয়তো আপনি বলতে পারেন, কুকুর কামড়ালেও কি তাকে মারা যাবে না? যাবে। তবে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি সাপেক্ষে। আইনে এও উল্লেখ আছে যে, এ আইনের ২৩ ও ২৫ ধারা অনুযায়ী দুর্দশাগ্রস্ত বা অনুপযুক্ত কোন পশুকে ম্যাজিস্ট্রেট আরোগ্যালয়ে পাঠানো কিংবা নিধনের আদেশ দিতে পারেন। সূত্রঃ পশু-নির্যাতন-আইন-১৯২০।
সেই ১৯২০ সালে ইংরেজরা পশু নির্যাতনের জন্যে জরিমানা ধরেছিলো দুই শত টাকা। যা বর্তমানের হিসেবে লাখ টাকার উপরে। আর ইংরেজদের বলা হয়ে থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান জাতি। তারা পশু নির্যাতনের ব্যাপারটাকে এতটা সিরিয়াসভাবে নিয়েছে। নিশ্চয় সেটা তারা কোনো গবেষণা বা চিন্তা ছাড়া অনর্থক করেনি এসব ব্যাপারগুলো মাথায় রেখেই গত ২০ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভায় ‘প্রাণী কল্যাণ আইন-২০১৬’র নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এই আইনে প্রাণী (পশু) হত্যা, ও পশুর সাথে নিষ্ঠুর আচরণ ও অতিরিক্ত কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য করলে জেল ও জরিমানার বিধান রাখা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত সাপ্তাহিক বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেছিলেন, ১৯২০ সালের বিদ্যমান নিষ্ঠুরতা আইন পরিবর্তন করে নতুন খসড়া আইনটি প্রণীত হয়েছে। তিনি আরো বলেন, মানুষ ছাড়া মেরুদণ্ড গৃহপালিত ও পোষা প্রাণী এ আইনের আওতামুক্ত হবে। প্রস্তাবিত এই আইনে প্রাণী হত্যা ও গুরুতর আহতের ক্ষেত্রে ২ বছর জেল ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং নিষ্ঠুর আচরণের জন্য ৬ মাস জেল ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে প্রাণী সম্পদ অধিদফতরের মহাপরিচালক বা তার অনুমোদিত কর্মকর্তা বা পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর থেকে ঊর্ধ্বতন পদমর্যাদা সম্পন্ন কর্মকর্তা এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে পারবেন। অতএব, ভবিষ্যতে এমন উদ্ভট ও বীভৎস মানুষ হত্যা বা ডেঞ্জেরাস ক্রাইমগুলোকে বন্ধ করতে হলে আমাদেরকে এমন পশু হত্যার মতো বিষয়গুলোকেও গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে। আজ যে রাস্তার একটি প্রাণীকে নৃশংসভাবে হত্যা করতে পেরেছে, কাল সে একটি মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করতে দ্বিধা করবে না। আজ যে একটি পশুর উপর বর্বরতাকে সহজভাবে নিতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে, কাল সে মানুষের উপরের বর্বরতাকেও সহজভাবে নিতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। তাই, এখনই সময় নিজে সুস্থ হওয়ার। সমাজকে সুস্থ করার।


