তথ্য সংগ্রহে, উমাইর: বীণ বাজালে সিনেমায় সাপ নাচে। বাস্তবে নাচে না। সাপের কান নাই। শোনার জন্য ঘনঘন জিহ্বা বের করতে হয়।
সাপ আপনাকে আক্রমণ করবে না। আপনি যদি শব্দ করে হাঁটেন, সে বুঝতে পারে। সাপের বুকের তলায় খোলসের রঙ আলাদা। সেখানে বিশেষ স্নায়ুতন্তু থাকে। মাটির কম্পন বুঝতে পারে। আপনি কতদুরে আছেন, আপনি সাইজে কতবড়, সে বুঝতে পারে। পালিয়ে যায়।
বেলি, হাস্নাহেনার গন্ধে কখনো সাপ আসে না। কেউকেউ জীবদ্দশায় বেলি, হাস্নাহেনা গন্ধরাজের তলায় সাপ দেখেছেন হয়তো। মনে রাখবেন, সাপের ঘ্রাণশক্তি খুবই দূর্বল। সে গন্ধ পায় না।
সুগন্ধি ফুলে পোকামাকড় আকৃষ্ট হয় বেশি। পোকা খেতে ব্যাঙ আসে। ব্যাঙ খেতে মাঝেমাঝে সাপ আসতে পারে। খাবার পর মানুষের মত সাপও ক্লান্ত হয়। মানুষ খাবারের পর যেমন আয়েশ করে ঘুমায় তেমনই সাপও বেলি-হাস্নাহেনার তলায় ঘুমুতে পারে। তবে এসব গাছ যদি বাড়ির ভেতর থাকে তবে সাপ কম আসে। কারণ মানুষের উপস্থিতি তারা ভয় পায়। তবে বাড়ির সাইডে, ঝোপঝাড়ে এমন গাছ থাকলে সাপ আসা স্বাভাবিক।
একটা সাপকে মারলে তার জোড়া সঙ্গী কখনোই আপনাকে খুঁজে দংশন করতে আসবে না। সাপের স্মৃতিশক্তি খুবই দূর্বল। সাপ বাংলা সিনেমার স্বর্পরাজ শাকিব খান কিংবা নাগিন মুনমুন নয়
যে সঙ্গীহারার প্রতিশোধ নিতে ছুটে আসবে। সাপ নিম্নজাতের প্রাণি। এদের মধ্যে রিভেঞ্জ বলে কিছু নাই। কিন্তু একটা সাপ মারার পর আরেকটা সাপ প্রায়ই একই স্থানে দেখা যায়, কারণ কী?
সিম্পল। মেটিং এর সময় তাদের পার্টনার আশেপাশে থাকতেই পারে কিংবা আশেপাশে গর্ত থাকলে তার বাচ্চাকাচ্চা কিংবা আরো সাপ উঠে আসতেই পারে। সে প্রতিশোধ নিতে আসেনি বরং ভুল করে গর্ত থেকে চলে এসেছে।
ছোট সাপের বিষ নাই। কথাটা ভুল। সাপের বাচ্চাও সাপ। কেঁচোর সমান একটা কেউটের কামড়ে আমার চোখের সামনে এক রোগীকে টানা ২৪ ঘণ্টা জীবনের সাথে ফাইট করতে হয়েছে। আইসিইউতে আমরা তিন ডাক্তার তার পাশে ২৪ ঘন্টা লড়েছিলাম। আর্টিফিশিয়াল ভেন্টিলেশন থেকে শুরু করে একাধিকবার অ্যান্টি-ভেনম দিয়েছি। সে সুস্থ হয়ে বাড়িতে গেছে। যাবার আগে আমাদের গালিগালাজ করে গেছে। আমরা নাকি তাকে অনেক দামী ঔষুধ দিয়েছি। সে জানে না, একডোজ অ্যান্টিভেনমের দাম ১০ হাজার টাকা। লজিক্যালি লোকটার দোষ নেই। সে ছিল জেলে। দিনে হয়তো এক দেড়শ টাকা তার ইনকাম।
রাতে যারা বাজার থেকে অন্ধকারে ঘরে ফেরে তাদের এবং জেলেদের সাপ বেশি কাটে।
জেলেরা বর্ষায় রাতে আইল বরশি ফেলে, জাল ফেলে মাছ ধরে। নদী বা নালায় মাঝ ধরে। সাপ শুকনো ভেবে সেখানে থাকে। কামড় দেয়।
সিনেমা বলে, সাপ দুধ খায়। গরুর দুধ খেতে গোলাঘরে হানা দেয়। ভুল কথা। এসব সাপ ক্ষেতের ব্যাঙ-পোকামাকড় খায়। কালো রঙ্গের দাড়াশ সাপ দেখি, এরা আমাদের উপকার করে। ফসল বাঁচায়। এদের না মারা উত্তম।
সাপে কাটলে ব্লেড দিয়ে কেটে দিলে বিষ বের হয়ে যায়। কথাটা ভুল। ভুলেও এই কাজ করবেন না। ব্লেড দিয়ে কাটলেন তো বিষকে রক্তের সাথে নিজহাতে মিশিয়ে দিলেন।
দংশন করা সাপকে উল্টোকামড় দিলে বিষ ফেরত চলে যায় সাপের ভেতরে। কথাটা ভুল। পায়ে কাটলে বিষ সেখানে। আপনার মুখের দাঁতে তো বিষ নাই। কীভাবে ফেরত দিবেন?
সাপের বিষ তার দাঁতে থাকে না। সে যখন কামড় দেয় তার মুখের পেশিগুলো টানটান হয়ে যায়। দাঁতের কাছেই ঠাকে বিষধর। সেখান থেকে বিষ দাঁত বেয়ে আপনার শরীরে প্রবেশ করে।
শক্ত করে বাঁধলে বিষ ছড়াতে পারে না এমন ধারনা ভুলে যান। আপনি নিজেও নিশ্চিত না সাপটা বিষধর ছিল কি না, তাহলে শক্ত করে বাঁধবেন কেন? অনেক ডাক্তার সাপে কাটার পর বাঁধতে নিষেধও করেন। কারণ এতে হিতে বিপরীত হয়।
ফুটবলের অ্যাংলেট পায়ে দিলে যেমন আটসাট হয়ে থাকে এমন ভাবে গামছা বা শার্ট বা শাড়ি দিয়ে দংশনের কিছু উপরে পেঁচিয়ে নিতে পারেন। বাঁধন অবশ্যই ঢিলা রাখবেন। দুট আঙ্গুল ঢোকে এমনভাবে ঢিলা করবেন। আবার খুব ঢিলাও না। ২০ মিনিট পরপর খুলে আবার লাগাতে পারেন। ভুলেও লোহার তার, সুতলি, কারেন্টের তার বা অন্য সরু জিনিস দিয়ে বাঁধবেন না। বাঁধলে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে হাতে-পায়ে পঁচন শুরু হবে। চিরতরে হাত বা পা খোয়ানোর সম্ভাবনা প্রবল। হয়তো আপনাকে বিষধর সাপ কাটেই নি অথচ আপনি ভয়ে গিট্টু দিয়ে হাত পা পঁচিয়ে পঙ্গু হয়ে গেলেন। কেমন হবে?
সাপ কাটলে কিন্তু আংটি, চুড়ি, ব্রেসলেট খুলে ফেলবেন। কিছু সাপের বিষে আপনার আঙ্গুল, হাত বা পা ফুলে যেতে পারে। আংটি বা চুড়ি থাকলে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে পঁচন ঘটতে পারে।
সাপ কখন দংশন করে?
১। যদি ভুলে আপনার মুখোমুখি হয় সে পালাতে চেষ্টা করে। কিন্তু সে নিজে ভয় পেলে হিংস্র হয়। সব প্রাণিই এমন। মুরগীরও মাঝেমাঝে মানুষকে ঠোকর দেয়। সামনে সাপ পড়লে তাকে চলে যেতে দিন।
২। বর্ষাকাল মানেই হাসপাতালে সাপে কাটা রোগী। বর্ষায় গর্তে পানি উঠে যায়। ফলে সাপ ডাঙ্গায়, শুকনো জায়গায় উঠে আসে। সেটা ক্ষেতের আইল, রাস্তা কিংবা আপনার ঘরের তোশকের তলা, বালিশের তলা, আলনার ভেতর, কাঠের স্তুপ যেকোন জায়গাতেই আসতে পারে।
৩। অন্ধকারে সাপের শরীরে পা পড়লে। জঙ্গলায় ভুলে তার শরীরে পা পড়লে কামড় দেয়।
৪। ইদুরের গর্তে সাপ থাকলে সেখানে পা রাখলে বা বসে থাকলে কামড় দিতে পারে। বাচ্চা ছেলেরা মাঝেমাঝে বসে গর্তের মুখে প্রস্রাব করে। সন্তানকে শিক্ষা দিন। এই কাজ যেন না করে।
সব সাপ বিষাক্ত?
বাংলাদেশে ৮০ ধরণের সাপ আছে। মাত্র ২৭ তা বিষাক্ত। অধিকাংশই সামুদ্রিক। মাত্র ৫/৬ প্রজাতি স্থলে আছে যারা বিষধর।
আপনার চোখের সামনে নিয়মিত যাদের ঘোরাফেরা দেখেন, তারা বিষাক্ত নয়। পানির সাপ অধিকাংশই বিষাক্ত নয়। তবে সামুদ্রিক সাপ সবাই বিষাক্ত।
যদি চেনেন তবে বলি গোখরা, কালকেউটে, শঙ্খচূড়, চন্দ্রবোড়া বিষাক্ত।
সাপে কাটলে বুঝবেন কীভাবে?
দংশন করেছে এমন মনে হবার পর যদি সরাসরি সাপ দেখেন, তাহলে ভাবতে পারেন সে আপনাকে দংশন করেছে।
একবার এক ছেলে হাসপাতালে আসল।মাটির ঘরে অন্ধকারে হেলান দিয়ে ছিল। পীঠে সাপ কেটেছে। সারাদিন হাসপাতালে আমাদের অবজারভেশনে ছিল।রাতে রিলিজের আগে খবর আসল, যেখানে হেলান দিয়ে ছিল, সেখানে কে যেন তারকাটা পুতে রেখেছিল।পীঠে লেগে তারকাটা দেয়ালে ঢুকে যায়। খোচা লাগাকে সাপে কাটা ভেবে সে হাসপাতালে আসে।২৪ ঘণ্টা ভয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে ঘরে ফেরে সুস্থ।


