যৌন জীবনের সিদ্ধান্ত ব্যক্তির একান্ত নিজের। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে সমকামীতা রাষ্ট্র স্বীকৃত একটি স্বাভাবিক ঘটনা। প্রশ্ন হল বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কি তেমন হওয়া উচিৎ?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদেরকে বুঝতে হবে আবহাওয়া, জলবায়ু, ভৌগলিক অবস্থান, সামাজিক প্রথা, শিক্ষা, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মূল্যবোধ, মানুষের জ্ঞানের পরিধি, শারীরীক সক্ষমতা, সময়ের প্রবাহ ইত্যাদির কারণে এক এক দেশের আইনের মাঝে বিস্তর পার্থক্য দেখা যায়। আইনের প্রশ্নে (question of law) আসা যাক। বাংলাদেশে সমকামীতার আইনগত অবস্থান কী?
দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী সমকামীতা একটি অপরাধ। এর শাস্তি হল যাবজীবন কারাদণ্ড, অথবা দশ বৎসর পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থ দণ্ড। এ ধারায় শুধুমাত্র সমকামীতাকে অপরাধ বলা হয়নি। বরং এর সাথে পশুর সাথে যৌন সঙ্গমকেও একই অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করেছে। যার নাম হল অস্বাভাবিক অপরাধ বা প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সঙ্গম।
চলুন ধারাটি ভালভাবে পড়ি-
ধারাঃ ৩৭৭। অস্বাভাবিক অপরাধসমূহঃ
কোন ব্যক্তি যদি প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে কোন পুরুষ, স্ত্রীলোক বা পশুর সাথে যৌন সঙ্গম করে, তবে সে ব্যক্তি যাবজীবন কারাদণ্ডে, অথবা দশ বৎসর পর্যন্ত যেকোন মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং তদুপরি অর্থ দণ্ডেও দণ্ডিত হবে।
এই ধারায় বর্ণিত অপরাধের জন্য আবশ্যকীয় যৌন সঙ্গমের জন্য যৌনাঙ্গ প্রবিষ্ট করাই যথেষ্ট হবে।
এ ধারা মতে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের বিরুদ্ধে সঙ্গমকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সে অর্থে মূলত নারী বা পুরুষের পায়ুপথে যৌন সঙ্গম ও পশুর সাথে যৌন সঙ্গমকে একই শ্রেণীভূক্ত করা হয়েছে। কোন পুরুষ যদি কোন নারীর সাথেও যদি পায়ুপথে সঙ্গম করেন, সেটিও সমকামিতার মতই অপরাধ বলে গণ্য হবে।
নূর মোহাম্মদ ওরফে বগ মাস্টার ভার্সেস দি স্টেট (১৯৮৯) মামলাতে বাংলাদেশের হাইকোর্ট ডিভিশন সমকামীতাকে “অত্যন্ত নোংরা কর্ম” বলে অভিহিত করে।
এখন কেউ যদি বাংলাদেশে সমকামিতা করে, কিংবা এমন স্পষ্ট বে-আইনী কাজের প্রসার ঘটাতে চায়, তাহলে সেটা অপরাধ বলে গণ্য হবে। আর যেকোন অপরাধের বিচার করবে আদালত। মনে করুন, জনাব “ক” জনাব “খ” কে হত্যা করল কিংবা অন্যদেরকে “খ”-কে হত্যা করতে অনুপ্রেরণা দিল। আইনত এটি অপরাধ এবং এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। তবে এই অপরাধীকে “খ” এর পরিবার কিংবা অন্য যে কোন ব্যক্তি, এমনকি পুলিশও নিজ হাতে শাস্তি দিতে পারবে না। তাকে আদালতের দারস্থ হতে হবে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে আত্মরক্ষার্থে কাওকে হত্যা করা যাবে।
সমকামিতা এদেশে একটি গুরুতর অপরাধ। তার অবাধ প্রসার ঘটাতে চাওয়ার অর্থ দাঁড়ায় ব্যাপক ভিত্তিতে একটি অপরাধ সংঘটনের প্ররোচনা দেয়া। প্রচলিত আইনে এটিও একই রকম অপরাধ। কেউ এমন বে-আইনী কাজ করলে আপনারা তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করুন, তার বিচার প্রার্থণা করুন। কিন্তু কোনভাবেই তাকে হত্যা করতে পারেন না কিংবা হত্যার হুমকি দিতে পারেন না। এমনটি করলে আপনি উক্ত সমকামী ব্যক্তির থেকেও বড় অপরাধী বলে গণ্য হবেন।
এবার আউট অফ দ্য বক্স কিছু পর্যালোচনা করা যাক। সমকামিতাকে অপরাধ বিবেচনা করে তার সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের এই যে আইনী বিধান বাংলাদেশে বলবৎ রয়েছে, তার প্রণেতা ছিল বৃটেন। ১৮৬০ সালে তারা আমাদেরকে এই আইন দেন। তবে বর্তমানে বৃটেনে সমকামিতা কোন অপরাধ নয়। বরং অন্যান্য দেশের সমকামী ব্যক্তি, যারা নিজ দেশীয় আইনে বিচার ও শাস্তির সম্মুখীন হতে পারেন কিংবা জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে, তাদেরকে বৃটেনের মাটিতে আশ্রয় দেবার জন্যেও সে দেশে আইন রয়েছে, আদালতের নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। শুরুতেই লিখেছি আবহাওয়া, জলবায়ু, ভৌগলিক অবস্থান, সামাজিক প্রথা, শিক্ষা, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মূল্যবোধ, মানুষের জ্ঞানের পরিধি, শারীরীক সক্ষমতা, সময়ের ব্যাবধান ইত্যাদির কারণে এক এক দেশের আইনের মাঝে বিস্তর পার্থক্য দেখা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ অনেক দেশেই সমকামিতা বর্তমানে অপরাধ নয়। ভারতেও আমাদের দেশের মত বৃটেন প্রদত্ত একই আইন ছিল। তবে তারা সেটি বদলিয়েছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি এবং অর্থনীতিতে উন্নত দেশগুলোতে ব্যক্তি স্বাধীনতার (লিবার্টি) কনসেপ্ট সামাজিক মূল্যবোধে পরিণত হয়। যার মূলকথা হল কোন ব্যক্তি যদি অন্যের ক্ষতি না করে কিংবা আইনে নিষিদ্ধ কোন কাজ না করে নিজের জীবনকে উপভোগ করতে চায়, তবে তার সে অধিকার আছে। তাতে রাষ্ট্র বা অন্য কোন ব্যক্তি হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, বাঁধা দিতে পারবে না। কেউ যদি ঘরে বসে মদ খায়, বিবাহ বহীর্ভূতভাবে যৌন সম্পর্ক করে, কিংবা যা খুশি তাই করে, সেটি যদি আইনে নিষিদ্ধ না হয় বা অন্য মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়, তাহলে তার সে কাজে কেউ বাঁধা দিতে পারবে না। কর্মব্যস্ত মানুষ অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে অযাচিত হস্তক্ষেপ করার সময় পান না। আমাদের দেশের মানুষের হাতে কাজ কম, বেকারের সংখ্যা বেশি। অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে জমিয়ে মাথা ঘামানো তাদের জন্য এন্টারটেইনমেন্ট হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঘুষ, জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করা, খুন, ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া ইত্যাদি কিন্তু সমকামিতার থেকে কোন অংশে কম অপরাধ নয়। আবার মাঝেমাঝে পত্রিকায় খবর প্রকাশ হয় আবাসিক মাদ্রাসায় হুজুরের দ্বারা শিশু ছাত্র বলাৎকারের শিকার। যেটি একইসাথে সমকামিতা এবং ধর্ষণ। পবিত্র কুরআনে খুন, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়া, ঘুষ ইত্যাদিকে সমকামিতার থেকে কম গুরুতর অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়নি নিশ্চয়। এদেশের প্রতিক্রিয়াশীল মানুষগুলো ঘুষ, সরকারি তথা জনগণের অর্থ আত্মসাৎ, ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া, খুন কিংবা নারী ও পুরুষ ধর্ষণের ক্ষেত্রে সংশ্লীষ্ট ঘুষখোর, অর্থ আত্মসাৎকারী, খুনি কিংবা মানুষকে নির্যাতনকারীকে হত্যা করে না বা হত্যার হুমকি দেয় না। এমনকি কার্যকর প্রতিবাদ পর্যন্ত করে না। যদি কার্যকর প্রতিবাদ করত, তাহলে দেশের মানুষের জীবন অনাবিল সুখে ভরে যেত। তাহলে পরিষ্কার হয়, তারা কেবলমাত্র স্পেসিফিক কিছু বিষয়ে ব্যক্তিগত উগ্র আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ। আর যেহেতু অপরাধ বা অন্যায় রুখে দেবার অভিপ্রায় তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়, সেহেতু তাদের এই আবেগকে অথর্ব বললে অত্যুক্তি হবে না।
যারা সমকামিতা কী জিনিস বোঝেন না, তাদের উদ্দেশ্যেঃ সমকামিতা হল নারীর সাথে নারীর বা পুরুষের সাথে পুরুষের যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা।
যেভাবে সমকামিতা করা হয়ঃ
পুরুষেরা পায়ূপথে এবং নারীরা বর্তমানে সেক্স টয় বা কৃত্রিম পুরুষাঙ্গ হাতে ধরে বা অন্য নারীর কোমরে বেল্টের সাথে বেঁধে তা দিয়ে যৌন সঙ্গম করে। সাথে অন্যান্য ফোর প্লে থাকে। যারা সমকামী, তাদের মাঝে যে কেবল যৌন সম্পর্ক থাকে তা নয়, তার সাথে পার্টনারের প্রতি প্রেম-ভালোবাসার ফিলিংসও থাকে।
সমকামীদের কি সন্তান হতে পারে?ক্লোনিং, টেস্টটিউব, গর্ভ ভাড়া ইত্যাদি প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা পরিবারে সন্তানের সূচনা করতে পারে। সমকামীদের ক্ষেত্রে ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে সন্তান ধারণ করার প্রযুক্তি নব দিগন্তের সূচনা করবে। কোন জীব থেকে অযৌন প্রক্রিয়ায় হুবহু চেহারা ও বৈশিষ্ট্যের একটি জীব সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে ক্লোনিং বলে। নিচু শ্রেণির কিছু জীব (যেমন- উদ্ভিদ, ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদি) প্রাকৃতিকভাবে অযৌন প্রক্রিয়ায় বংশ বিস্তার করে। মানুষ বা অন্যান্য উঁচু শ্রেণির প্রাণীর ক্ষেত্রে গবেষণাগারে বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে ডিএনএ (DNA) এর খণ্ডিত অংশ অথবা স্টেম সেলের মাধ্যমে ক্লোনিং করা হয়।
২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মানব গবেষণা কেন্দ্র ক্লোনেইডে প্রথম ক্লোন শিশুর জন্মদান করানো হয়। বিষয়টির মূলকথা তারা ভিন্ন জেন্ডারের কারোর সাথে যৌন সঙ্গম না করেও সন্তান নিতে পারে, যদি চায়। ড. ইয়ান উইলমুট স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় রোসলিন ইনস্টিটিউটে ১৯৯৬ সালে ফিন ডরসেট ভেড়ীর ওলান থেকে সংগৃহীত কোষের নিউক্লিয়াস অন্য জাতের ভেড়ীর ডিম্বকোষে প্রতিস্থাপন করে হুবহু একই রকম ফিন ডরসেট ভেড়ীর বাচ্চা জন্মাতে সক্ষম হন। এখানে দুটিই ভেড়ী এবং এটি একটি অযৌন প্রক্রিয়া। শিশুটি ছিল কন্যা এবং তার নাম রাখা হয় ইভ (খ্রিস্টানরা মানব ইতিহাসের প্রথম নারীকে ইভ বলে, আর মুসলিমরা তাকে হাওয়া (আঃ) বলে)।
তবে মানুষের ক্ষেত্রে আধুনিক এ আবিষ্কারের ব্যবহার প্রতিক্রিয়াশীলদের আপত্তির মুখে বর্তমানে সকল দেশেই নিষিদ্ধ। হয়ত ৫০ বা ১০০ বছর পর মানুষের ক্ষেত্রেও ক্লোনিংয়ের ব্যবহার স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হবে।
কারোর কোন কাজ পছন্দ না হলে আদালতে যান। আইন পছন্দ না হলে আপনাদের জনপ্রতিনিধিদের কাছে উপযুক্ত আইন প্রণয়নের দাবি করুন, আন্দোলন করুন। উপযুক্ত আইন অনুযায়ী তাদের বিচার হবে। ব্যক্তিগতভাবে কাওকে হত্যা করার অধিকার কারোর নেই। কেউ যদি এমন করেন, তারও শাস্তি হবে।
সমকামের চিত্র ভাবলে আমার গা গুলায়, পছন্দ হয় না। তবে সমকামীদেরকে বা তা সমর্থনকারীদেরকে বা অন্যান্য অপরাধীদেরকে ব্যক্তিগতভাবে হত্যা করা বা হত্যার হুমকিদাতাদের কার্যকলাপ দেখলেও অনুরূপ গা গুলায়, পছন্দ হয় না, ঘৃণা আসে।
মতিউর রহমান, শিক্ষার্থী আইন বিভাগ, ২০১৫-১৬ সেশন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
Emai: [email protected]


