বর্তমান ভার্চুয়াল কোর্ট অতি সীমিত পরিসরে পরিচালিত একটি বিচার ব্যবস্থা। সুপ্রীম কোর্ট অঙ্গণে কয়েকটি মাত্র কোর্ট খোলা রয়েছে। জরুরী জামিন আর গুরুত্বপূর্ণ রিটকারী আইনজীবী ছাড়া অন্যপ্রকার মামলার জন্য বিজ্ঞ আইনজীবীদের তৎপরতা খুব একটা চোখে পড়ছে না আদালত এলাকায়। যারা দুই একটি মামলা পরিচালনা করছেন তাঁদের অনেকে কোর্ট এলাকায় আসছেন বারের মূল্যবান সিল মেরে নিতে কিংবা অন্যান্য কাজে।
বর্তমানে ভার্চুয়াল কোর্টগুলিতে যে রিলিফসমূহ দেওয়া হচ্ছে সেগুলি রেগুলার কোর্ট চালু হওয়ার সাথে সাথে আবারও সংশ্লিষ্ট কোর্ট হতে ভার্চুয়াল কোর্ট প্রদত্ত আদেশগুলি কনফার্ম করে নিতে হবে। সুতরাং, রেগুলার কোর্ট খোলার সাথে সাথেই কোর্ট অঙ্গণ ভার্চুয়াল কোর্ট প্রদত্ত আদেশগুলি রি-কনফার্ম করতেই বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়তে পারে। এদিকে, ইতোমধ্যেই হাজার হাজার মামলার জট তৈরী হয়ে বসে আছে। হাজার হাজার বিচারপ্রার্থী বিচারের আশায় প্রহর গুনছেন। অনেকেই সত্য-মিথ্যা নানা অপরাধে অভিযুক্ত হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কোর্টে সারেন্ডার করে জামিন চাইবেন- সেটি পারছেন না। পুলিশ কোনভাবে যদি একবার ভেতরে ঢোকায়, কবে বের হতে পারবেন- তার ঠিক-ঠিকানা নেই৷ তাই অনেকেই মনে করছেন, ভেতরে ঢুকে কষ্ট করার চেয়ে পালিয়ে বেড়ানোই ভাল। কিছুদিন আগে মুক্ত পৃথিবীর আলোবাতাস খেয়ে নিই। পরেরটা পরে দেখা যাবে।
হাজার হাজার নাগরিক আজ নানা আইনী প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত। কেউ মামলা করে ন্যায় বিচারের জন্য অপেক্ষা করছেন, কেউ ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য আদালতে যাবেন বলে অপেক্ষা করছেন। প্রতিনিয়তই নাগরিকগণ নানা অন্যায় অনিয়মের শিকার হচ্ছেন। প্রয়োজনীয় বিচার ব্যবস্থা চালু না থাকায় তারা সে সকল অন্যায়গুলি সহ্য করে যাচ্ছেন নিরবে নিভৃতে।
আজ এক বিজ্ঞ আইনজীবী মামলার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট ভার্চুয়াল কোর্টের ই-মেইলে সেন্ড করতে গিয়ে দেখছেন বার বার রিসিপিয়েন্ট ইনবক্স ফুল দেখাচ্ছে। অনেক চেষ্টা করে বেচারা ইমেইল সেন্ড করতে সক্ষম হলেন। আবার, কষ্ট করে সেন্ড করতে সক্ষম হলেও সেখানে ই-মেইল রিসিভিং কোন সিরিয়াল নম্বর নেই। কে আগে পাঠাচ্ছে, আর কে পরে পাঠাচ্ছে সেটি কেউ জানে না। শুধু জানে সংশ্লিষ্ট কোর্টের দায়িত্বরত অফিসার মহাশয়। কবে নাগাদ হিয়ারিং হবে তা অনুমান করা অত সোজা নয়। অনেক আইনজীবী বলছেন, তদবীর না করলে মামলা হিয়ারিং করানো বেশ কঠিন, ফাইল পড়ে থাকবে দিনের পর দিন। তাহলে কী অনেক বিজ্ঞজন পরে ই-মেইল করেও বিশেষ কারো ছোট হাতে বড় নোট গুঁজে দিয়ে মামলার সিরিয়াল নম্বর আগে নিয়ে নিচ্ছেন? এখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য কোন জনাব কী রয়েছেন?
ট্রায়াল কোর্টে জরুরী জামিন বাদে অন্যান্য মামলার ব্যাপারে কতটুকু কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সেটি আমার অজানা। উচ্চ আদালতে জরুরী কিছু বিষয় ছাড়া সকল কার্যক্রম বন্ধ। একটি রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান অর্গান হলো বিচার বিভাগ। অথচ বিচার বিভাগ ভার্চুয়াল কোর্টের নামে কার্যত অচল হয়ে পড়ে রয়েছে। হয় রেগুলার কোর্ট চালু করা উচিত নয়ত ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে সকল কোর্ট খুলে দেওয়া হোক। একজন ভুক্তভোগী, একজন অত্যাচারিত নাগরিক যখন বিচার পায়না, কিংবা জরুরী মুহূর্তে বিচার ব্যবস্থাকে নিজের পাশে পায় না তখন সে সত্যই অসহায়। তার দুঃখের সমাধানের আর কোন জায়গা থাকে না।
যথাসময়ে বিচার না পাওয়া কিংবা বিচার পেতে যথেষ্ট বিলম্ব হওয়া একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন সেটি মনে হয় আমরা বুঝতে সক্ষম হচ্ছি না। সকল আইনজীবীগণ চুপচাপ বসে আছেন। চারিদিকে সুনশান-নিস্তব্ধতা, কেউ কোন মন্তব্য করছেন না। মন্তব্য করে পাছে সমালোচনার শিকার না হন।
বাস, ট্রাক, ট্রেন সহ সকল যোগাযোগ-ব্যবস্থা চালু রয়েছে। রাষ্ট্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ আজ স্বাস্থ্য বিধি মেনে সচল, অথচ বিচার বিভাগটি কার্যত অচল। প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও স্বাস্থ্য বিধি মেনে বিচার বিভাগ দ্রুত পুরোপুরি চালু করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা খুবই জরুরী। কোর্ট অঙ্গণে আইনজীবী এবং বিচারপ্রার্থীদের ভিড় কমানোর নানা পন্থা রয়েছে। সেগুলি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। সামগ্রিকভাবে নাগরিকদের বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হলে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে সকল কোর্ট চালু করতে হবে। আর তা না হলে স্বাস্থ বিধি মেনে রেগুলার কোর্ট চালু করা হোক।
রায়হান কাওসার, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।
Email: [email protected]


