রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেব কিছু দাবী থাকতেই পারে। কিন্তু দাবীগুলো যখন রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে করা হয়না, দাবীগুলো পূরণ করলে রাষ্ট ও তার অন্যান্য উপাদান কি কি সমস্যায় পড়বে তা বিবেচনায় রাখা হয় না তখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় নেতিবাচক কিছু আসতে পারে। রাষ্ট্রের কাছ থেকে দাবীগুলো সবার সাথে সমন্বয় করে চাইতে হবে ও অন্যকেও সুযোগ দেবার মানসিকতা থাকতে হবে তা না হলে জাতীয় ঐক্যে সমস্যা দেখা দিতে পারে। রাষ্ট্রের সমস্যা সমাধানে অবদান না রেখে তা হতে পারে সমস্যা সৃষ্টির কারন।
একব্যাক্তির বাড়িতে আগুন লাগলো। সে তার বাড়ির আগুন নিভাতে সাহয্যের জন্য চিৎকার করতে থাকলো। পাশের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলো এক খড়ি বিক্রেতা সে ভাবলো লোকটাকে কিভাবে সাহায্য করা যায়। তখন সে তার সাথে থাকা খড়ি বাড়ির আগুনে দিলো আগুন নিভানোর উদ্দেশ্যে। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো আরো এক ব্যাক্তি তার সাথে ছিলো কেরোসিন। সেও মনে মনে ভাবলো কেরোসিন দিয়ে যদি ব্যক্তিটির উপকার হয় তো হোক। অত:পর সে তার কেরোসিন আগুনে ঢেলে দিলো সেই অসহায় ব্যাক্তির আগুনে দাউ দাউ করে জলা বাড়িতে। দু’ব্যক্তিই চেয়েছিলো যাতে করে আগুন নিভে কিন্তু ফল হয়েছে তার উল্টো। তাদের উদ্দেশ্য খারাপ ছিলো না তবুও ফল খারাপ হয়েছে । করোনা সংকটে বর্তমানে কিছু সংকট আরো স্পষ্ট হয়েছে ও তার সমাধানের জন্যে নিজের জায়গা থেকে সমাধানের চেষ্টা চলছে। আপাতত কাজগুলো সমাধান করা প্রয়োজন মনে হলেও তার থেকে জাতিগত সমস্যা কত বড় হতে পারে তাও ভাববার বিষয় আছে। কেননা এই কাজগুলো শ্রেণীগত চিন্তার প্রতিফলন যা রাষ্ট্রে স্বাভাবিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে বিশেষ বিঘ্ন তৈরী করছে।
গামেন্টস মালিক চাচ্ছে প্রণোদনা, নন-এমপিওভূক্ত শিক্ষক চাচ্ছে এমপিও ভূক্তি, কেউ দাবী করছে প্যানেল শিক্ষক নিয়োগের, কারো দাবী পরীক্ষা ছাড়াই সনদ দেয়া, আইনজীবীরা অতি সম্প্রতি দাবী করছে কোর্ট খুলে দিতে, কালো টাকার মালিক চাচ্ছে কালো টাকা সাদা করার সহজ সুযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চাচ্ছে অনলাইন ক্লাসের জন্য সকল সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে, পরিবহন চাচ্ছে তার পরিবহন চালাতে, কৃষকের ফসলের দামসহ নানা দাবী নানা মহল থেকে আগেও ছিলো এখনো আছে। গাড়ির ড্রাইভার হিসেবে নিজের আয়ের জন্য পরিবহন চালু করার দাবী অমূলক নয়। কেউ যদি তার জীবনের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য এমপিওভুক্তি চায় সেটাও কোনভাবেই অমানবিক দাবী নয় বরং মানবিক দাবী। কোন কিছুকেই তাই অবহেলা করার সুযোগ নাই। দাবীগুলোকে অস্বিকার করা যায়না বটে খন্ডন করা যায়।
আগের অর্থবছরে মাথাপিছু ঋণের পরিমান ছিলো ৬৭ হাজার ২৩৩ টাকা। এবছর এই পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৭৯হাজার টাকা।দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে মধ্যবিত্তরা সমস্যায় আছে ঢাকা ছাড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষ। সাম্প্রতিক সময়ের যে বাজেট ও বিভিন্ন মহলথেকে যে দাবীগুলো করা হচ্ছে তার সাথে অবশ্যই সম্বনয় করা উচিত। ব্যক্তি প্রত্যাশা যদি সামষ্টিক ক্ষতির কারন হয় তাহলে তার চেয়ে লজ্জাজনক আর কি হতে পারে। রাষ্ট ও তার অবস্থা ভেবে না ভেবে সব কিছুর সাথে সম্বনয় না করে যে দাবীগুলো রাখা হয় তা শুধু রাষ্ট্রের মাঝে প্রতিষ্ঠানগত জটিলতাই তৈরী করেনা বরং জাতীয় সমস্যাও সৃষ্টি করতে পারে। দেশের খন্ড খন্ড চিত্রগুলোকে অখন্ড করা জরুরী।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০১৬ অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার সাড়ে ২৪ শতাংশ ছিল । ২০১৯ সালে তা ৪ শতাংশ কমে হয় ২০ শতাংশ। গত ৭ জুন সিপিডি প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা হয় করোনার কারণে দেশে দারিদ্র্যের হার ৩৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এই প্রতিবেদন টি কঠিন বাস্তবতার প্রকাশ ঘটায়।
সম্প্রতি পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, করোনা মহামারীর এই সংকটে শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের আয় ৮২ শতাংশ ও গ্রামাঞ্চলের নিম্ন আয়ের মানুষের ৭৯ শতাংশ আয় কমেছে। কিছু পরিবার তিন বেলা খাবার জুটাতে পারে না। দেশের করোনা মহামারীতে যে বাজেট দেয়া হলো ও দেশের যা পরিস্থিতি তাতে সবাই মিলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক মোকাবেলা করতে অবশ্যই সবার অংশ্রগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সামষ্টিক ভাবে সমস্যাগুলো বিবেচনা করতে হবে শ্রেণীগত বা ব্যক্তিগত ভাবে সমস্যাগুলোর সমাধান দাবী করা যাবে না।
১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ হয়েছিলো। সেটি একটি সম্প্রদায়গত বিদ্রোহ বলা যায়। তখনকার প্রেক্ষাপটে ও স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটে তার যথেষ্ট অবদান অস্বীকার করার মত না। নীল বিদ্রোহ বা ভাষা আন্দোলন কারো গুরুত্বই কম নয়। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে প্রতিবাদ না করে উপায় থাকে না। একটি সম্প্রদায়ের প্রতিবাদ আর সবার সমস্যাগুলো নিয়ে সব সম্প্রদায়ের সামষ্টিক প্রতিবাদ আলাদাভাবে দেখতে ও বিশ্লেষণ করতেই হবে। ছোট ছোট আন্দোলন যখন ছোট সমাধান দ্বারা সমাধা করা হবে তখন তার থেকে আরো কিছু সুবিধা বঞ্চিত তৈরী হবে ও সমাজের সমস্যাগুলো আরো বেশী বেড়ে যাবে নতুবা এমন হবে যার মাধ্যমে একটি বিশেষ শ্রেণীকেই বারবার শোষিত করা হবে। বিছিন্ন আন্দোলন গুলো যদি সামষ্টিক কল্যাণ চিন্তা থেকে না হয় তাহলে তার কিছু মানুষ পায়।
রাষ্ট্রে বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন নেশার ও বিভিন্ন ধর্ম বর্ণের মানুষ বাস করে। দেশকে সাজানোর বাসনা কম বেশী সবাই ধারণ করে। তার জন্য যেমন কিছু দাবী থাকে তেমন কিছু ক্ষেত্রে থাকে দ্বায়িত্ব। পেশাগত যোগাযোগ বা এক পেশার সাথে অন্য পেশার যোগসূত্র, মানুষের সামাজিকীকরণকে অপরিহার্য করে তুলে। বাস্তুসংস্থান বা অভিযোজন প্রক্রিয়ার মত মানুষকে কিছু নিয়ম মানতে হয় যা সে নিজেও হয়ত জানে না। এই নিয়মগুলো আবিস্কার খুব জরুরী। সরকার পরিবর্তন হলে স্কুলের সিলেবাস পরিবর্তন হয়, যাদের বারবার টেলিভিশনে দেখা যেত তাদের উপস্থিতি পরিবর্তন হয়ে যায়, শিল্পী, শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধরণ ও ধারণে আসে নানা পরিবর্তন। এমনটি হতেই পারে। মেীলিক কাঠামো ঠিক রেখে ইতিবাচক পরিবর্তনকে সাধুবাদ যে কোন ইতিবাচক মানুষ জানাবেই। তবে ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো স্থায়ী করার মত হলেও যদি তা অস্থায়ী হয়ে যায় তাহলে তা নেতিবাচক ফল দিতে পারে। তাই সাবধান থাকতেই হয় ও হবে।
ধর্মের ভিত্তিতে, কর্মের ভিত্তিতে, ভাষার ভিত্তিতে, আশার ভিত্তিতে, ভাবের ভিত্তিতে, ভাবনার ভিত্তিতে জাতি ও জাতীয়তা আলাদা আলাদা তৈরী হতে পারে। এক ধর্ম যদি তার মহত্ত্ব প্রকাশ ও প্রচার করতে সব সুবিধা চায় বা কেউ তার কর্মের নিশ্চয়তার জন্য অন্যের কর্ম অনিশ্চিত করে তবে তার থেকে যে স্বার্থপরতার জন্ম হয় তার ফল হয় উদ্বেগজনক ও ভীতিকর। রাষ্ট্রের মাঝে সমন্বয় করে যদি শক্তি বৃদ্ধি করা না যায় বা দূর্বল জায়গাগুলো সবল করতে শুধুমাত্র শ্র্র্র্রেণীগত চিন্তা করা হয় তাহলে রাষ্ট্র একসময় তার কৃত মহৎ কাজগুলো থেকে নেতিবাচক কিছু পেতে পারে। করণীয় কাজগুলো যখন শুধুমাত্র কারন থেকেই করা হবে তা যতই মজবুত করে করা হোক না কেন তার থেকে অনিশ্চিয়তা তৈরী হতেই পারে। তাই এখন গল্পটির মত ভাবতে হবে কাজটি ভালোর জন্য করা হলেও তা কতটা ভালো করতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতি বা বাইরের কোন দেশের সাথে কি রকম সম্পর্ক হবে তা যদি সরকার পরিবর্তন হওয়ায় সাথে সাথে পরিবর্তন হয়, ক্ষমতার পরিবর্তন হবার সাথে সাথে যদি বিশেষ গোষ্টী অন্য গোষ্ঠীর উপর প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠে তবে বুঝতে হবে জাতিগত একতায় ঘাটতি আছে। জাতিগত সমন্বয় থাকলে এই সমস্যাগুলো হতো না, জনগণ যখন সামগ্রিক চিন্তা করবে তখন সামগ্রিক সুফল আসবে। একটি স্থায়ী মঙ্গল জনক রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য জাতিগত সম্বনয় খুবই জরুরী। সরকার পরিবর্তন হতে পারে কিন্তু রাষ্ট্রের যে সুযোগ সুবিধা তা কখনো পরিবর্তন হবে না এই চিন্তা সাধারন চিন্তা ও এই কাজ সাধারন কাজ না হওয়া পর্যন্ত সাবর্জনীন শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।
প্যারাডাইজ ক্যাবলসের শ্রমিকরা ১৩ মাসের বেতনের দাবীতে আন্দোলন করছে। এটি তাদের স্বার্থপরতা নয় কিন্তু স্বার্থরক্ষার ও বেচে থাকার জন্য সঠিক রাস্তায় লড়াই। যখন কেউ তার চাকুরীতে মোটর-সাইকেল পাবার পর প্রাইভেট কার পাবার জন্য আরো সুযোগ সুবিধা পাবার জন্য হন্যে হয় তখন বুঝতে হবে তার মাথায় শ্রেণী সমস্যা জনিত জাতিগত সমস্যা আছে। যার কারনে রাষ্ট্রের অন্যান্য উপাদানগুলো ও অংশগুলো কিভাবে সমন্বয় করবে তা নিয়ে তার কোন ভাবনা বা কোন মাথাব্যাথা নেই। রাষ্ট্রে নিজের একটি নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত হবার পর অন্যান্য যারা তাদের নূন্যতম সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তাদের জন্য কাজ করেই জাতিগত বিভেদ ও সমস্যা দূর করা যাবে। যে কোন সংকটময় মুহূর্তে একতার সাথে একাগ্রতায় লাড়ে মিথ্যা ভিত নড়িয়ে দেওয়া যাবে। জাতিগত ঐক্য ও কাজ না বুঝতে পারলে তা সংকট তৈরী করতেই থাকবে। রাষ্ট্রের সবার কথা বিবেচনা করে নিজের প্রয়োজন মিটাতে হবে, রাষ্ট্রের কাছ থেকে দাবী করতে হবে। প্রয়োজনে সম্বনয় করতে হবে সম্বনয় করাতে হবে, শ্রেণীগত দাবী থেকে বের হতে হবে তবেই স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাবে।
নূরুন্নবী সবুজ, আইন বিশ্লেষক ও কলামিষ্ট।
[email protected]


