এস এন নাঈম আহম্মেদ
আজও বলা হলো না কতটা ভালবাসি তোমায়। “বাবা” দুটি অক্ষরের নাম বহন করে হাজারো স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। বাবা মানে সন্তানের চোখে প্রথম সুপারম্যান।বাবা মানে নিজের ছেঁড়া জুতো পড়েও সন্তানের জন্য দামী জুতো কিনে আনা।বাবা এই শব্দটির মাঝেই কোথাও একটা লুকিয়ে আছে স্নেহের কনা।যে কণাটির তেমন গুরুত্ব পায় না ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি পদ প্রাপ্ত কিছু ব্যক্তির কাছে। সেই পথ প্রাপ্ত মানুষেরা হয়তো কখনোই জানতে পারবেন না তাদের সেই পদ পর্যন্ত নিয়ে যেতে সেই মানুষটির না খেয়ে কাটানোর দিনগুলোর কথা।
আমরা কি কখনো ভেবেছি এই বাবাই আমাদের শত আবদারের অদ্ভুত ভান্ডার। বাবা তো সে জিনিস সব বিপর্যয় বলে ভয় কিসের আমি তো আছি। বাবা তুমি বড্ড,, হ্যাঁ কারণ তুমি নিজেকে পর্যন্ত করেছো আমাদের সুখের জন্য। আজও আমার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। যখন গাড়ি ভাড়ার টাকা বাঁচিয়ে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরে এসে যখন দেখতো আমি ঘুমিয়ে গেছি,, ঠিক তখনই কপালে চুমু দিয়ে বলতো,, খোকা ,,,, খোকা ঐ দেখ তোর জন্য কি নিয়ে এসেছি। সকালে যখন স্কুলের জন্য নিজ হাতে আমাকে রেডি করিয়ে দিতে, নিজে গিয়ে ছেড়ে আসতেই স্কুলের গেটে, আজও সেই স্মৃতি গুলো আমার চোখে ভেসে ওঠে। আজও ফিরে যেতে ইচ্ছে করে সেই ছেলেবেলায়। কিন্তু তা আর সম্ভব।জানো বাবা তোমার লাগানো সেই পেয়ারা গাছটিতে আজও আগের মতোই ফুল আসে। থোকায় থোকায়,, কিন্তু তুমি কোথায় বাবা?
তোমার মনে আছে বাবা একদিন আমার জ্বর হয়েছিল। আমার স্পষ্ট মনে আছে,,তুমি সারারাত আমার মাথার কাছে জেগে ছিলে ,, সারা রাত আমার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলে। কিন্তু এখন জ্বর হলে কেউ পাশে বসে থাকে না বাবা। কেউ আর মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় না। তুমি কোথায় বাবা? আমি এখন বাবার রুমে বসে আছি। ঠিক বাবা যেখানে বসতেন ওইখানে। নাকি আসছে বাবার শরীরের ঘ্রাণ। এখনো কি গিয়ে যাচ্ছে বাবার হাজারো হারানো স্মৃতি। এখনো আনমনা হয়ে শুনছি তার অদৃশ্য কন্ঠ। আবার মাঝে মাঝে কেমন যেন টের পাচ্ছি,,, বাবার পবিত্র আত্মার উপস্থিতি। হ্যাঁ এইতো বাবা,, এইতো তার চাদর গামছা এইতো অবহেলায় পড়ে থাকা বাবার প্রিয় চশমাটি।
এসব যেন তাকে না পাওয়ার বেদনায় নিস্তব্ধ হয়ে আছে। চারপাশের দেয়াল গুলো বাবাকে না পেয়ে ব্যথা দূর দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আমার দিকে। ওরা কি যেন বলতে চায়।কিন্তু আমার মতো বোধ হয় অধিক কষ্টে ওদের বলার ভাষা হারিয়ে গেছে।আমি জানি কষ্ট আর কষ্ট একসাথে হলে কখনো কখনো মুখের ভাষা হারিয়ে যায়। পূর্ব পাশে হ্যাঙ্গারে ঝুলানো বাবার একটা পাঞ্জাবী। ইচ্ছে করছিল পাঞ্জাবি টা ধুয়ে দেই’। কিন্তু পাঞ্জাবির কাছে গেলে বাবার শরীরের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।গানটা হারিয়ে যাবে বলে পাঞ্জাবিটা দুধের ইচ্ছে করে না।রুমের এক কোনায় বাবার ভাঁজ করা লুঙ্গিটা একাকীত্বের যন্ত্রণা নিথর হয়ে আছে।একাকীত্বের যন্ত্রণা যে কত নির্মম তা এখন ভালোভাবে বুঝতে পারি।
বাবার মাথার বালিশটা কেমন যেন দুমড়ে-মুচড়ে আছে। হয়তো হারানোর শোক তাকেও ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছে।রাতের গভীরে বাবাকে না-পাওয়ার বালিশটা রাতের আঁধারে আমার মতো কাঁদে কিনা কে জানে?ছোট্ট টেবিলের উপর বাবার মোটা চশমাটা অযত্নে থেকে থেকে ধুলোর সাথে বন্ধুত্ব করেছে।একবার চেয়েছি ওর শরীর থেকে ধুলো টা মুছে দেই। কিন্তু বাবার ছোঁয়ার ওপর নতুন করে ছুদার ইচ্ছে করেনি। উত্তর পাশে জানালাটা বাবা লাগিয়ে রেখে গিয়েছিলেন।
সেদিন প্রচণ্ড গরমে জানালা খুলতে গিয়েও ফিরে এসেছি। কেন যেন মনে হইছে জানালাটা বাবার স্মৃতি হারাতে চাইছে না। তাই কঠোর হাতে জানালার শেষ স্মৃতি মুছে দেওয়ার সাহস হয়নি। হোক কষ্ট হোক। বদ্ধ ঘরে কাঠফাটা গরমে আমার না একটু কষ্টই হোক। তবুও ওরা বাবার স্মৃতি ধরে রাখুক। বাবার স্মৃতি সাথে নিয়ে ওরা ওদের মত থাকুক। আমি নিজের সুখের জন্য ওদের স্মৃতি মুছে দিতে পারবো না।বাবার ভাঁজ করা লুঙ্গি পাঞ্জাবী বালিশ মোটা ফ্রেমের চশমা আর রুমালের সাথে বাবা বেঁচে থাকুক। আমি না হয় মাঝে মাঝে ওদের থেকেই খুঁজে নেব প্রিয় বাবাটা কে। আজ তোমায় খুব মনে পড়ছে বাবা। ভালো থেকো ওপারে।
লেখকঃ শিক্ষার্থী ও গল্পকার।


