সব
facebook apsnews24.com
পূজা বিশ্বাসের বৈবাহিক জীবনে এত আইনী বৈষম্য কেন? - APSNews24.Com

পূজা বিশ্বাসের বৈবাহিক জীবনে এত আইনী বৈষম্য কেন?

পূজা বিশ্বাসের বৈবাহিক জীবনে এত আইনী বৈষম্য কেন?

এ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

কুষ্টিয়ার মেয়ে পূজা বিশ্বাস (ছদ্মনাম) এর সাথে ঢাকার অপূর্ব বিশ্বাস (ছদ্মনাম) এর হিন্দু শাস্ত্রমতে বিয়ে হয়। বিয়ের সময় নিয়ম ও প্রথা মেনে পূজার বাবা মেয়ের সুখের জন্য নগদ টাকা, ব্যবহার্য আসবাবপত্র ও স্বর্ণালঙ্কার ছেলেকে প্রদান করেন। কিন্তু বিধিবাম! কয়েক বছর যেতে না যেতেই অপূর্ব বিশ্বাস প্রথম স্ত্রী পূজা বিশ্বাসকে কোনো কিছু না জানিয়ে কিংবা তার অনুমতি ব্যতিরেকে আরেকটি বিয়ে করেন এবং দ্বিতীয় স্ত্রী রূপালী বিশ্বাসকে নিয়ে সুখে বসবাস শুরু করেন। এদিকে পূজা বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে নিদারুণ কষ্টে জীবন যাপন করতে থাকেন। কিন্তু হিন্দু ধর্মের বিধান মতে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরিষ্কার বিধান না থাকায় তাকে নিয়মকানুন মেনে চলতে হচ্ছে। হিন্দু আইনে তালাক দেয়ার কোনো প্রকার বিধান না থাকায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পূজা বিশ্বাসকে অপূর্ব বিশ্বাসের স্ত্রী হয়েই বেঁচে থাকতে হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে পূজা বিশ্বাসের ভরণপোষণ দেবে কে? কীভাবে কাটবে তার বাঁকি জীবন। যদি তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করতে পারে তবে কেন পূজা বিশ্বাস পারবে না। এটি একটি মানবিক প্রশ্ন।

বিবাহবিচ্ছেদের ক্ষেত্রে হিন্দু নারীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কারণ মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী, নারীদের বিবাহবিচ্ছেদের যেমন অধিকার আছে (কাবিননামার ১৮ নাম্বার ঘরের শর্ত সাপেক্ষে), হিন্দুদের বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে তেমন কোনো আইন নাই। অথচ হিন্দু আইনে একজন পুরুষ যত ইচ্ছা বিয়ে করতে পারেন কিন্তু স্ত্রী চাইলেও বিবাহবিচ্ছেদ চাইতে পারেন না। ভরণপোষণের ক্ষেত্রে অবশ্য দুই ধর্মেই ভরণপোষণ সংক্রান্ত আইন রয়েছে। উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে রয়েছে বৈষম্যমূলক আইন। মুসলিম আইনে নারীরা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারেন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর করার অধিকার তাঁদের রয়েছে। কিন্তু হিন্দু আইনে উত্তরাধিকারী হলেও ক্ষেত্র খুবই সীমিত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রচলিত দায়ভাগ মতবাদে হিন্দু নারীরা জীবনস্বত্বে এবং স্ত্রীর মালিকানাধীন এ দুভাবে উত্তরাধিকারী হতে পারেন। জীবনস্বত্বের ক্ষেত্রে এ সম্পত্তি কোনো নারী বেঁচে থাকা পর্যন্ত ভোগদখলের এখতিয়ার লাভ করেন। কিন্তু আইনগত কারণ ছাড়া এ সম্পত্তি তিনি হস্তান্তর করতে পারেন না। তার মৃত্যুর পর ওই সম্পত্তি তার উত্তরাধিকারীর ওপর না বর্তিয়ে যার কাছ থেকে এটি পেয়েছিলেন তার নিকটবর্তী উত্তরাধিকারীর কাছে চলে যায়। তবে স্ত্রীর নিজস্ব কোনো সম্পত্তি হলে তা তার উত্তরাধিকারীর মধ্যে বর্তাতে পারে।

ভারতে ১৯৫৬ সালে হিন্দু উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত আইন পাস হওয়ার পর পিতার মৃত্যুর পর পুত্র ও কন্যা সমান অংশ লাভ করে। মুসলিম আইনে সন্তানের অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে পিতাই সন্তানের আইনানুগ অভিভাবক। তবে মা সন্তানের নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত দেখাশোনা করতে পারেন। হিন্দু আইনে বাবার পর মা সন্তানের অভিভাবক হতে কোনো বাঁধা নেই। তবে কোনো বিবাহিত হিন্দু নারীর যদি স্বামী মারা যায় তাহলে ওই বিধবা নারী ১৮৬৫ সালের হিন্দু বিধবা পুনর্বিবাহ আইন অনুযায়ী আবার বিয়ে করতে পারবেন এবং এ বিয়ের ফলে যদি কোনো সন্তান জন্মলাভ করে তবে সে সন্তান বৈধ সন্তান বলে বিবেচিত হবে। তবে বিধবার আবার বিয়ে হলে সে তার আগের স্বামীর কাছে আইনের দৃষ্টিতে মৃত বলে গণ্য হন এবং সে কারণে পুনর্বিবাহের ফলে তার সাবেক স্বামীর সম্পত্তির ওপর থেকে তিনি অধিকার হারান।

হিন্দু সম্প্রদায়ের সুবিধার্থে ১০০ টাকার মাধ্যমে ‘ডিক্লারেশন অব গিফট’ আইন পাস করা হয়েছে। এর ফলে হিন্দুরা তাদের মেয়েদের কোনো ধরনের জিনিস দিতে চাইলে মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে একটি দলিল করতে পারবে। প্রয়োজনে হিন্দু বিবাহ বিচ্ছেদ ও উত্তরাধিকার বিষয়ে আইন প্রণয়নে পৃথক কমিশন গঠন করা যেতে পারে।

মূলত এ জাতীয় সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণের জন্য দরকার সার্বজনীন পারিবারিক আইন। কারণ প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক যে, ফৌজদারি কোনো অপরাধ যেমন- চুরি, মারামারি কিংবা খুনের জন্য জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র ভেদে কোনোরকম বৈষম্য প্রদর্শন করা না হয় তবে কেন বিয়ের ক্ষেত্রে এ জাতীয় বৈষম্য মেয়েদের মেনে নিতে হবে। পাশাপাশি হিন্দু বিয়েতে রেজিস্ট্রেশনে বাধ্যতামূলক কোনো বিধান না থাকায় বিয়ে তালাক কিংবা একই স্বামীর একাধিক স্ত্রী গ্রহণের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার আইনি সহায়তা পান না হিন্দু নারীরা। এভাবে হিন্দু নারীরা বিয়ের ক্ষেত্রে ভয়াবহভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। অথচ বিয়ের ক্ষেত্রে মুসলিম আইনে রয়েছে বাধ্যতামূলক রেজিস্ট্রির বিধান। বিবাহ রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী, এ বিধান না মানা হলে শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু নির্যাতনের শিকার হিন্দু নারীরা এ ক্ষেত্রে প্রতিকার পায় না।

অন্যদিকে খ্রিস্টান ধর্ম মতে, বিয়ে সামাজিক বন্ধন। পাশাপাশি হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্ম মতে বিয়ে একটি ধর্মীয় বিষয়। এ ছাড়া মুসলিম বিয়েতে স্ত্রীরা স্বামীর কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ মোহরানা পায় এবং বিবাহবিচ্ছেদ হলে তিন মাসের খোরপোষ (ভরণপোষণ) পায়; কিন্তু অন্য ধর্মে এ জাতীয় কোনো বিধান নেই। মুসলিম বিয়ে একটি চুক্তি হিসেবে গণ্য হওয়ায় বিয়ের কাবিননামা অবশ্যই রেজিস্ট্রি করতে হয়। কিন্তু অন্য ধর্মের অনুসারী স্বামী যদি বিয়ের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে তবে স্ত্রীর বিয়ে প্রমাণের কোনো উপায় থাকে না। তাই পারিবারিক বৈষম্য বন্ধে এখনই উপযুুক্ত সময় একটি ‘ইউনিফরম ফ্যামিলি কোড’ প্রণয়নের। বর্তমান সরকার নারীর অধিকারের সর্বোচ্চ সম্মানের কথা বিবেচনায় রেখে একটি ইউনির্ফম ফ্যামিলি কোড প্রণয়ন করার উদ্যোগ নিলে তা নারী বৈষম্য দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। শুধু নারী নির্যাতন বন্ধ কিংবা নারী-পুরুষের সমানাধিকার বুলি ফোটালে হবে না, পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণে অভিন্ন পারিবারিক আইন গ্রহণের এ উদ্যোগকে আরো সক্রিয় করতে হবে। তবেই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা হবে, নারীর অধিকার হবে সমুন্নত।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’। , মোবাইল: ০১৭১৬-৮৫৬৭২৮

  • 18
    Shares

আপনার মতামত লিখুন :

অভিভাবকের অসম্মতিতে প্রেমের বিয়ে, মামলা ও ফলাফল!

অভিভাবকের অসম্মতিতে প্রেমের বিয়ে, মামলা ও ফলাফল!

বিচারক ও আইনজীবী সুসম্পর্ক, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অন্যতম নিয়ামক

বিচারক ও আইনজীবী সুসম্পর্ক, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার অন্যতম নিয়ামক

রাষ্ট্রের নেতা পরিবর্তন হয়, পররাষ্ট্র নীতি নয় !

রাষ্ট্রের নেতা পরিবর্তন হয়, পররাষ্ট্র নীতি নয় !

ফৌজদারী মামলায় সন্দেহের সুবিধা ও বাস্তবতা!

ফৌজদারী মামলায় সন্দেহের সুবিধা ও বাস্তবতা!

“মার্কিন নির্বাচন ২০২০ ও বিশ্বরাজনীতি”

“মার্কিন নির্বাচন ২০২০ ও বিশ্বরাজনীতি”

বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ১৩ বছর: বিচারক সংকট মামলাজট নিরসনে অন্যতম অন্তরায়

বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ১৩ বছর: বিচারক সংকট মামলাজট নিরসনে অন্যতম অন্তরায়

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার: ApsNews24.Com (২০১২-২০২০)

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ নুরুন্নবী চৌধুরী সবুজ
01774-140422
প্রকাশকঃ আইনী পাঠশালা গ্রুপ
২২ চ্যামেলীবাগ (সিআইডি অফিসের পাশে) রমনা থানা, ঢাকা-১০০০।
01625-461876, 01771-784299
[email protected], [email protected]
Developed By Feroj

ব্রেকিং নিউজ