সব
facebook apsnews24.com
আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই -সাদাত হোসাইন - APSNews24.Com

আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই -সাদাত হোসাইন

আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই -সাদাত হোসাইন

এপিএস বুক রিভিউ

আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই
-সাদাত হোসাইন

অিামার আর কোথাও যাওয়ার নেই’: বৃত্তবদ্ধ মানুষের উপাখ্যান….

যূথচারী পাখির মতো মানুষেরও বসবাস। মানুষ এবং পাখি দুয়েরই আছে নিজস্ব নিয়ম-শৃঙ্খলা। মানুষ এ নিয়ম মানে তার স্বার্থের প্রয়োজনে আর পাখি তার স্বাভাবিকতায়। তাই পাখির যেমন ইচ্ছে জাগে কানামাছি খেলার মানুষেরও জাগে অনুরূপ। কিন্তু মানুষ ইচ্ছে মতো এই খেলায় অংশ নিতে পারে না। সবাই যে পারে না, তা নয়। কেউ কেউ পারে, যাদের সমাজ ব্যবস্থায় রয়েছে প্রভাব-প্রতিপত্তি। ‘আমার অার কোথাও যাওয়ার নেই’ উপন্যাসেও আমরা দেখি এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে।

সাদাত হোসাইন সমাজের একেবারে মূলে প্রবেশ করে, সেখান থেকে নির্যাস টেনে টেনে উপন্যাসের চরিত্র এবং ঘটনাগুলো উপস্থাপন করেছেন। সহজ ভাষা, সহজ উপস্থাপন অথচ কী জটিল সেই মানুষের জীবন। একেবারে শিকড় ধরে টান দিয়েছেন তিনি। বৃত্তবদ্ধ জীবনে মানুষের যে মুক্তি নেই, নেই কোথাও যাবার অধিকার সেটা কী অনায়াসেই ঔপন্যাসিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তাই এই উপন্যাসের চরিত্রগুলো (একমাত্র লাবণী ছাড়া) বৃত্তের বাইরে যেতে না পারলেও চেষ্টার ত্রুটি করেনি। ঔপন্যাসিক দায়বদ্ধ সমাজ ও দেশের মানুষের কাছে। তাই সেই সমাজ ও মানুষের মৌলিক বিষয়গুলো তাঁর লেখায় বেশ উজ্জ্বলভাবেই ওঠে এসেছে।

সমাজ কাঠামোয় অর্থ এবং রাজনীতি সকলকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। সেই চেষ্টা সবক্ষেত্রে জয়যুক্ত হয় না। আবার যেসব ক্ষেত্রে জয়যুক্ত হয় সেখানে কর্দম আর কৃমিকীটের বসবাস। মানুষের মন এবং মননে সেই কৃমিকীটের যত্রতত্র গতায়াত।

উপন্যাসের দিকে দৃষ্টি দিলে আমরা দুটি শ্রেণিকে খুব সহজেই চিহ্নিত করতে পারি। একদিকে অর্থ ও ক্ষমতার ব্যবহার ও অন্যদিকে নিরন্ন মানুষের নিত্য হাহাকার। এবার আমরা এই দুই শ্রেণির মানুষের চরিত্র আলোচনার মাধ্যমে ঔপন্যাসিকের মূল প্রবণতাগুলো খুঁজে দেখার চেষ্টা করবো:
উপন্যাসের বিত্তবান এবং কুটিল চরিত্রের প্রতিনিধি আজহার উদ্দিন। তিনি একই সাথে অর্থ এবং রাজনৈতিক পেশি শক্তির মাধ্যমে গোটা সমাজকে নিজের মুঠিতে বন্দি করে রেখেছে। এই বন্দি মানুষগুলোর মধ্যে রয়েছে তার ২৭ বছরের সংসার জীবনের সঙ্গী নাসিমা বেগম। আজহার উদ্দিন অত্যন্ত ধুরন্ধর এবং কুটিল চরিত্রের অধিকারী। যে নাসিমা বেগম ৫ ভাই ও বাবা-মাকে ত্যাগ করে প্রেমের টানে ঘর ছেড়েছিল আজহার উদ্দিনের সাথে, সেই আজহার উদ্দিনের কাছ থেকেই সে পেয়েছে সবচেয়ে বেশি দুঃখ-কষ্ট এবং যন্ত্রণা। তাই নাসিমার কাছে এই পৃথিবীর মায়া ক্রমাগত লোপ পেতে থাকে এবং অবশেষে বিষ পান করে মৃত্যুর হিমশীতল কোলে আশ্রয় নেয়। নারীরা সব কিছুর ভাগ দিতে চাইলেও স্বামীর ভাগ বা অধিকার কখনোই ছাড়তে চায় না। ফলে জোহরা নামের ১৮ বছরের একটি মেয়েকে যখন আজহার উদ্দিন বিয়ে করে আনে তখন আজহার উদ্দিনের প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায় নাসিমার কাছে। এমনকি তার ২২ বছরের মেয়ে লাবণী এবং ১৮ বছরের স্ত্রী জোহরার কাছেও উন্মোচিত হয়ে পড়ে তার আসল রূপ। লাবণী এবং জোহরা তাই নিজেদের মতো করে আজহার উদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে থাকে। লজিং মাস্টার বাদলকে লাবণী পছন্দ করলেও তার সাথে ঘর করতে পারেনি। তাই প্রতিশোধের চরম প্রকাশ হিসেবে লাবণী তার চেয়েও ৩০ বছরের অধিক বয়সী স্থানীয় সাংসদ আশফাককে বিয়ে করে। আজহার উদ্দিনের সকল স্বপ্ন-কল্পনাকে ধূলিস্মাৎ করে ঘুণে ধরা সমাজের মুখে চুনকালি মেখে দেয় লাবণী। তাই লাবণী এই উপন্যাসের এক শক্তিশালী চরিত্র।

অন্যদিকে নিম্ন শ্রেণির মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে যেসব চরিত্র এই উপন্যাসের মূল ঘটনাকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন বাদলের বোন রাবেয়া এবং তার অসচ্ছল পরিবার। দিনমজুর শ্রেণির অন্যতম হিসেবে কালু, ফজলুর নাম বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া জয়নাল কসাই, রাবেয়ার শাশুড়ি লতিফা বানু, রাবেয়ার ৭-৮ বছরের ছেলে রতন এবং রতনের নিখোঁজ বাবা ফরিদ উল্লেখযোগ্য। সমাজ বাস্তবতায় ক্লেদ-পঙ্কিলতা শুধু ধনিক শ্রেণিরই সহজাত এমনটি নয়। অবদমিত নিম্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যেও রয়েছে কাম-বাসনার উৎকট প্রকাশ। ফজলুকে আমরা দেখি সে ধরনের চরিত্র হিসেবে। রাবেয়ার প্রতি কামের চরমতম প্রকাশ ঘটাতে গিয়েই ফজলু নিহত হয় কালুর দায়ের কোপে।

রাবেয়া চরিত্রটি সমগ্রতাদানকারী একটি চরিত্র। উপন্যাসের একেবারে মূল থিম তাকে ঘিরেই। রাবেয়ার মতো নিরন্ন অসহায় মানুষেরা সবদিক ধেকে ব্যর্থ হলেও তার চরিত্রে কোনো মলিনতার প্রকাশ আমরা দেখিনা। সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে না পারার কষ্ট, স্বামী ফরিদের নিখোঁজ হবার পরও অতি কষ্টে সংসারের ঘানি টেনে গেছে সে। এই ঘানি টানার পেছনে হয়তো শিকড়ের ব্যাপারও আছে। আছে সন্তান ও সংসারের প্রতি দায়বদ্ধতা। রাবেয়ার মতো নারীদের কোথাও যাবার নেই, তাই একই বৃত্তে বন্দি হয়ে থাকে এবং অপেক্ষা করতে থাকে স্বামীর জন্য। স্বামী ফরিদের ফিরে আসার মধ্য দিয়ে মিলনাত্মক পরিণতির মাধ্যমে উপন্যাসটি শেষ হয়েছে। নিম্নের চুম্বক বাক্যের মধ্য দিয়ে রাবেয়ার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে লেখক রেখেছেন তাঁর প্রাতিস্বিকতার পরিচয়-
‘তার হঠাৎ মনে হলো, এই মানুষটাকে ছেড়ে সে কোথাও যাবে না। কোথাও না।’

অন্তর্জীবনের অন্তর্জ্বালা উপন্যাসের ক্যানভাসে যেমন ওঠে এসেছে তেমনি ওঠে এসেছে সমাজ জীবনের কিছু ক্লেদাক্ত চিত্র। তাই উপন্যাসের চরিত্রগুলো এবং ঘটনাপুঞ্জ পরস্পরের সাহচর্যে লাভ করেছে অখণ্ড সমগ্রতা।
পড়ে দেখতে পারেন, এমন জীবন কাহিনী হয়তো আমার আপনার আশে-পাশেই অহরহ ঘটে চলছে কিংবা আমার আপনার জীবনও এই একই বৃত্তে ঘূর্ণমান।

এ. এইচ. এম. আওরঙ্গজেব জুয়েল

প্রাকাশক: ভাষাচিত্র (প্রথম প্রকাশ: একুশে বইমেলা ২০১৪, তৃতীয় মুদ্রণ: একুশে বইমেলা ২০১৯)
মুদ্রিত মূল্য: ১৬০ টাকা
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৭৯
গ্রন্থের প্রকৃতি: উপন্যাস

আপনার মতামত লিখুন :

রিভিউ বই : আওয়ামী লীগ উত্থান পর্ব ১৯৪৮-১৯৭০

রিভিউ বই : আওয়ামী লীগ উত্থান পর্ব ১৯৪৮-১৯৭০

লজ্জাঃ উধোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো।

লজ্জাঃ উধোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো।

বুক রিভিউ বই:দিবারাত্রির কাব্য

বুক রিভিউ বই:দিবারাত্রির কাব্য

বুক রিভিউ: ‘মরণ বিলাস’। রচয়িতা আহমদ ছফা।

বুক রিভিউ: ‘মরণ বিলাস’। রচয়িতা আহমদ ছফা।

বই পাঠ পর্যালোচনা: বিশ্বাসঘাতক, নারায়ণ সান্যাল এর উপন্যাস

বই পাঠ পর্যালোচনা: বিশ্বাসঘাতক, নারায়ণ সান্যাল এর উপন্যাস

আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই -সাদাত হোসাইন

আমার আর কোথাও যাওয়ার নেই -সাদাত হোসাইন

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার: ApsNews24.Com (২০১২-২০২০)

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান
০১৬২৫৪৬১৮৭৬

editor@apsnews24.com, info@apsnews24.com
Developed By Feroj