।।সুজন বিপ্লব।।
প্যারামিডমশিফট বলতে আমূল পরিবর্তন বা বৈপ্লবিক রুপান্তর হিসাবে দর্শনের অবিভাজ্য বিষয় বিবেচনা করা হয়। অপরিসীম আত্মোৎসর্গ ও রক্তাক্ত পটভূমিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রাপ্তিযোগ ইতিহাসে প্যারামিডমশিফট হিসাবে উচ্চাসনে আসীন তদ্রুপ আরেকটি প্যারামিডমশিফট প্রত্যক্ষ করতে চায় দেশবাসী। সুখী-সমৃদ্ধ-হাসি-গান-কর্মে মুখরিত বাংলাদেশ বিনির্মানে শাসকশ্রেণীর স্হানে শ্রমিকশ্রেণী প্রতিস্থাপিত হলে প্যারামিডমশিফট সার্থক পরিণতি পাবে। বিশ্বে বেকারত্বের তালিকায় শীর্ষে থেকে স্বাধীনতার সুর্বণ জয়ন্তীর অঙ্গীকার কী হবে? কোটি-কোটি বেকারের মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী কোটি যুবক বেকার, তাদের কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি উপেক্ষা করে প্যারামিডমশিফট চিন্তন বাতুলতামাত্র। বেকারমুক্তকরণ পন্হায় উৎকৃষ্ট প্যারামিডমশিফট গোচরীভূত হয়। সকল বন্ধ্যাত্ব ঘুচিয়ে প্যারামিডমশিফট জনস্বার্থে প্রবহমান রাখার দায় রাষ্ট্রের কাঁধে বর্তেছে। প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগে বাংলা ভূখণ্ড, ভাষা, সংস্কৃতি, বাঙালিসহ অন্যান্য জাতিসত্তা, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা ও পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ভাষাসংগ্রাম, জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম, স্বাধীন বাংলার লড়াই, স্বাধীনতার ডাক ও মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপঞ্জিভুক্ত হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হিসাবে আজকের স্বাধীন ভূখণ্ড বাংলাদেশ ও বাংলাদেশী জাতীয়তা বিকাশমানের ধারায় ১৯৭১-২০২১ খ্রিস্টাব্দ, ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীকালে বাংলাদেশ কেমন আছে? স্বাধীন বাংলাদেশে প্যারামিডমশিফট কি পরিলক্ষিত হচ্ছে? মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের ঘোষণার ভিত্তিতে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে গৃহীত বাংলাদেশ সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনায় ৪টি মূলনীতি- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার অালোকে বহুজাতিক-সকল ভাষাভাষী জনগণ জাতিগত নিপীড়নমুক্ত, বৈষম্যহীন, শোষণ-বঞ্চনামুক্ত পরিবেশে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার অধিকার অর্জন করে। সবমুখে ভাত, সব হাতে কাজের মর্মবাণী নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ-এর গন্তব্য কোথায়? সেসবের হিসাব-নিকাশ জরুরিভাবে করা দরকার।
জনগণের কাছে পূর্বাপর রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত ক্ষমতাসীন সরকার সঠিক জবাব না দিয়ে মহান স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করার মধ্যে সম্পূর্ণরুপে কোন সার্থকতা নেই। জবাবদিহিতাহীন কর্তৃত্ববাদী সরকারের কাছে জনগন অনেকটা ইচ্ছাধীন খেলার পুতুলের মতো ব্যবহৃত হচ্ছে। ফ্যাসিবাদ যখন রাজ করে, সেসময় তো মানুষের জীবন-জীবিকার কোন নিশ্চয়তা থাকেনা। অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সর্বদা জনগণকে কর্মহীন করে, বেকার বানিয়ে ভাতে মেরে, পানিতে মেরে, ফতুর করে নিষ্পেষণ চলমান রাখে। জনগণের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে ও দেশের কোটি বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের প্রশ্ন অমিমাংসায় রেখে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন কখনই পরিপূর্ণ হতে পারেনা। বিপুল সাড়ম্বরে সরকার স্বাধীনতার সুর্বণ জয়ন্তী আয়োজন করলেও কোটি-কোটি বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের দাবি ধারণের সক্ষমতা দেখাতে পারছেনা।
বাংলাদেশ যখন উন্নত রাষ্ট্রের মর্যাদা বহন করে চলছে, তখন বেকার নিবন্ধন ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বিধানের বিকল্প নেই। ১০ টাকা সের চাল ও ঘরে-ঘরে চাকুরির প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সরকার কি চোখ-কান বুজে বসে রয়েছে? বেকার মানুষের কাজের ব্যবস্হা বাতলে দিতে হবে। ঘন বেকারত্বের দেশে সরকারের উন্নয়ন ফিরিস্তি আসলে লুটপাট-দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনা-ব্যর্থতাকে আড়াল করার কূটচাল, তা দিনের আলোর মতো দৃশ্যগত হচ্ছে। সরকার-প্রশাসন-রাষ্ট্রনীতির ন্যায়সঙ্গত বিরোধীতা করলেই রাষ্ট্রবিরোধী মামলার শিকার বানানো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচায়ক হয়না।
স্বাধীনতার সু্বর্ণ জয়ন্তী ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল এ মাহেন্দ্রক্ষণে বেকার নিবন্ধন ও কর্মসংস্থানের টাইমফ্রেম নির্দিষ্টকরণের অাশু ঘোষণা চাই। কর্মসংস্থানের লক্ষে কাঙ্খিত রোডম্যাপ ঘোষণার এক বছরের মধ্যে বেকারমুক্ত বাংলাদেশ দেখতে চাই। প্রকৃতপক্ষে উন্নত রাষ্ট্র বিনির্মানে বেকার সমস্যা জিইয়ে রাখার সুযোগ নেই। বেকারদের নাগরিক সম্মানী ব্যবস্হা অথবা কর্মসংস্থান; এ দুইয়ের মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নাগরিকগণের জীবনযাপনকে নির্বিঘ্ন করার দায়িত্ব গ্রহণে কোনপ্রকার অবহেলা করতে পারবেনা। অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও সাম্যের বাংলাদেশ গড়তে বেকার সমস্যা নিরসনে বাস্তবিক কর্মপরিকল্পনা নেওয়া জরুরি, অগ্রাধিকার হিসাবে কর্মসংস্থান করাটাও জরুরি। ২০২১ খ্রিস্টাব্দ বাংলাদেশ-এর জাতীয় জীবনে তাৎপর্যপূর্ণ, বাংলাদেশ ৫০ বছর স্পর্শ করছে। অমর ২১শে প্যারামিডমশিফট হিসেবে বৈশ্বিক ইতিহাস, ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে ১৯৫২’র ২১ ফেব্রুয়ারি এদেশের রক্তস্রোতে সৃজন গৌরবময় অধ্যায় হিসাবে সন্নিবেশিত হয়েছে। ১৯৭১’এ মার্চের ২১ তারিখও স্বাধীনতার দাবিতে উত্তাল দিনগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। তাই ২১ সংখ্যাটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনন্য প্যারামিডমশিফট, ২১ মানে মাথা নত না করা। বেকারত্ব দূরীকরণ, বেকার নিবন্ধন ও কর্মসংস্থানের টার্গেট রেখে সমাজপ্রগতির অভিযাত্রায় ২০২১ সত্যিকার অর্থে প্যারামিডমশিফট হিসাবে প্রকাশ্য হওয়ার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রুপ দেওয়ার চ্যালেঞ্জার কে হবে? রাষ্ট্র, কিন্তু প্রচলিত রাষ্ট্র দিয়ে কিছুই হবেনা। স্বাধীনতার সু্বর্ণ জয়ন্তীর চ্যালেঞ্জ পূরণে জীর্ণ-শীর্ণকায় রাষ্ট্রের খোলনলচে পাল্টে গণতান্ত্রিক আকাঙ্খার নয়া রাষ্ট্র ব্যবস্হা কায়েম করতে হবে। কর্মসংস্থানের বন্ধ দরজা খুলতে নানামুখী উদ্যোগ বিশেষ করে বিশেষায়িত পেশাভিত্তিক শিক্ষা গ্রহণ পরবর্তী নিবন্ধনের নামে অযৌক্তিক ও হয়রানিমূলক পরীক্ষা বাতিল করা উচিত। কর্মসংস্থান সংকুচিত করে এই নিবন্ধন পরীক্ষা নামক ছাঁটাইপ্রক্রিয়া রুখা খুব প্রয়োজন। প্রত্যেক নাগরিকের শোভন কাজের নিশ্চয়তাই মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অবিনাশী ও জাগরুক রাখবে চিরদিন। সাধারণ মানুষই বাংলাদেশ-এর নির্মাতা, তাদের পক্ষে, তাদের দ্বারাই নয়া প্যারামিডমশিফট ঘটুক; প্রতিক্ষার দিন প্রত্যক্ষ হোক।
লেখক: রাজনৈতিক কর্মী।


