বিলাসিতার বাসনা শুধু সন্তানেরা লালন করে না, অভিভাবকেরাও স্বেচ্ছায় লালন করেন। সন্তানদের জন্মদিনে বাইক কিংবা প্রাইভেট কার উপহার দেওয়ার চলন আছে অনেক অভিভাবকের মাঝে। এই সন্তান অবাধ্য হবে না তো কি কৃষকের ছেলে অবাধ্য হবে? কৃষকের ছেলে জানে কিভাবে রোদে পুড়তে হয়, বৃষ্টিতে ভিজতে হয়, অভাবের সাথে লড়তে হয়, সংগ্রাম করে বাঁচতে হয়। বিলাসিতায় জীবনকে উপভোগ করা যায় বটে, বোঝা যায় না।
অবৈধ টাকা খরচ করার জায়গা না পেলে মনে অনেক শখ জাগে। শখের বশে সন্তানেরা অনেক কিছু করে ফেলে। অভিভাবকের বিবৃতি এমন, “আমার একটামাত্র ছেলে, আমার একটামাত্র মেয়ে, যা সম্পদ আছে সবকিছুই তো ওদের জন্য।” সন্তানদের অপরাধ কর্মের অন্যতম যোগানদাতা এই অভিভাবকেরা। একটু খতিয়ে দেখলে বুঝবেন এই শ্রেণির অভিভাবকের অধিকাংশের আয়-রোজগারের উৎস মোটেও স্বচ্ছ নয়। সন্তানকে অতি আদরে মানুষ করবেন, সব আবদার মিটাবেন, আবার বলবেন ভালো হয়ে চলতে, তাহলে বিষয়টা কেমন হয়ে গেলো না? সন্তানকে আগুনে ফেলে দিয়ে ‘খোকা ফিরে আয়’ বললে কি চলে? সব কিছুর একটা সীমা আছে। সেই সীমা অতিক্রম করার সুযোগ দেন অভিভাবকেরা।
সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করতে না পারার কারণ খতিয়ে দেখলে মাত্রাতিরিক্ত বিলাসিতা, বেপরোয়া দুর্নীতি আর অভিভাবকের লাগামহীন উদাসীনতা সর্বাগ্রে সামনে আসবে। এ দায় এড়ানোর সুযোগ কই? সন্তানকে দামী স্কুলে শুধু পড়িয়ে কী লাভ! সন্তানকে মার্জিত হওয়ার লাইসেন্স শিক্ষকেরা পাইয়ে দেন না, ওটা শিক্ষার্থীকে পরিবার থেকে অর্জন করতে হয়। বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা বলেছিলেন, “বড় বড় নামকরা স্কুলে বাচ্চারা বিদ্যার চাইতে অহংকারটা বেশি শিক্ষা করে।” এই অহংকার ওরা পরিবার থেকে সওদা করে। কারণ দামী প্রতিষ্ঠানে পড়তে গেলে অনেক টাকা খরচ করতে হয়, সেখানে গরিব, কিংবা নিম্ন মধ্যবিত্তের ঠাঁই হয় না। তথাকথিত উচ্চবিত্তরা সেখানে অধ্যয়ন করে। পশ্চিমা রীতিনীতি ও সংস্কৃতির গিনিপিগে পরিণত হয় তারা। স্বেচ্ছাচারিতা আর অবাধ্যতা তখন ভর করে ওদের উপর। এটার সুযোগ করে দেয় ওদের প্রতিষ্ঠানগুলো।
সন্তানেরা কোথায় যায়, কার সাথে মিশে, কী করে এটা জানার দায় অভিভাবকের। সারাদিন নিজের কর্মক্ষেত্রে জীবিকার তাগিদে ব্যয় করে যে আয়-রোজগার তা যদি সন্তানদের জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে না আনে তাহলে সবকিছুই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। সন্তানের সব চাহিদা পূরণ করার লাইসেন্স না দিয়ে ওদেরকে জীবনকে বোঝার সুযোগ করে দিন, হে অভিভাবক। তা না হলে আপনার সারাদিনের শ্রম বৃথা। সন্তানদের ভাড়েও ভবানী অবস্থার জন্য আপনার দায় এড়াবেন কিভাবে? সন্তানদের ভিত শুরুতে নির্মাণ করতে ব্যর্থ হলে ওরাই একদিন আপনার ভিত নাড়িয়ে দিবে। তাই শুরুতেই ভিত শক্ত করুন, তারপর নির্মাণ করুন সুরম্য অট্টালিকা।
লেখকঃ মেহেদী আরিফ, গল্পকার, ছোটগল্প লেখক ও কবি, পাবলিশার্স।


