সব
facebook apsnews24.com
স্বপ্ন ও সাফল্যে মা - APSNews24.Com

স্বপ্ন ও সাফল্যে মা

স্বপ্ন ও সাফল্যে মা

মোঃ আনোয়ারুল হাকিম (আরাফাত)

সময়টা বর্ষাকালের মাঝামাঝি দুপুর ০২ টা ।টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। এমন সময়  আদিল তাদের খড়ের ঘরে বসে মহান আল্লাহ প্রদত্ত প্রকৃতির নির্মল সৌন্দর্য উপভোগ করছিল।হঠাৎ করে বাইরে ১০জন লোক এসে হাজির হল। তারা আদিলের বাবার খুনী কর্তৃক পাঠানো পুলিশ ছাড়া কেউ নয়। তারা এসে ভাঙ্গা দরজায় উকি দিল এবং বলল “বাসায় কেউ আছে কি?’’ ঘরের ভিতর থেকে আদিলের মা বলল“ কে আপনারা?” পুলিশ বলল “আমরা থানার লোক। এই ঘরে আদিল নামে কেউ আছে? ” মা বলল “কেন?” পুলিশ বলল “তার বিরুদ্ধে থানায় মামলা আছে?” এই বলে পুলিশ ভিতরে ঢুকে আদিলকে ধরে থানায় নিয়ে গেল।মা কান্নাকাটি করতে করতে থানায় হাজির হয়ে পুলিশকে কিছু বলার চেষ্টা করল কিন্তু পুলিশ কিছু শুনলো না।আর পুলিশ আদিলকে তড়িঘড়ি করে আদালতে হাজির করল।

মা তার ছেলেকে ছাড়িয়ে আনার জন্য ব্যাকুল হয়ে আদালতের শরণাপন্ন হল।মা তার মনের অব্যক্ত কথাগুলো বিচারককে খুলে বলল।বিচারক মহোদয় আদিল ও তার মায়ের বক্তব্য শুনে আদিলকে জামিন দিয়ে দিলেন। সেদিন মা তার একমাত্র ছেলেকে জামিনে মুক্ত করে মনে করল যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল।আদিলকে নিয়ে মা বাসায় চলে আসলেন।বিচারক  মহোদয়ের  কথা-বার্তা ও আচরণ দেখে মা এতটাই সন্তুষ্ট হলেন যে, আদিলকে বলতে লাগলেন“বাবা তোকে ঐ বিচারকের মত ন্যায় বিচারক হতেই হবে”।মায়ের কথাটা আদিলের অন্তরে জায়গা করে নিল।

তখন সে দশম শ্রেণীর ছাত্র।ভিতরে ভিতরে সে মায়ের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য প্রতিজ্ঞা বদ্ধ হল।সে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলাউদ্দীন আল আজাদের সাহায়তায় প্রতিজ্ঞা পুরণের লক্ষ্যে পড়ালেখা শুরু করল। পরের বছর তার অধ্যবসায়,পরিশ্রম এবং শিক্ষকের আন্তরিকতায় SSC তে GPA-5 পেল।ভর্তি হল দেশের অন্যতম কলেজ চট্রগ্রাম কলেজে। কলেজে পড়াকালীন সময় তার লক্ষ্য হল দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। সে SSC এর মত পুনরায় HSC তে GPA-5 পেল। এবার তার লক্ষ্য পুরনের পালা। সে অন্যান্য ছেলেদের মত অভিজাত পরিবারের ছেলে নয়।তাই তার পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং করা সম্ভব নয়। তাই সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক বড় ভাইয়ের শরণাপন্ন হল। সেই বড় ভাইয়ের পরামর্শ ও দিক নির্দেশনায় নিয়মিত পড়ালেখার মাধ্যমে নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা সম্পন্ন করে তুলল।

পরবর্তীতে ভর্তি পরীক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফরম উত্তোলনকরে ।যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ভর্তি পরীক্ষার তারিখ নির্ধারিত হল।তখন ঢাকায় এসে পরীক্ষা দেওয়ার মত টাকা আদিলের  নেই।তাই তাদের গৃহপালিত ছাগলটি বিক্রি করে মায়ের আশির্বাদ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হল।অচেনা ঢাকায় এসে সেই বড় ভাইয়ের হলে অবস্থান করল।পরের দিন শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্টিত হল। আদিলের পরীক্ষা অনেক ভাল হল।পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে বের হয়ে তার মাকে ফোনে জানায় “মা, তোমার সেই আশির্বাদ আর আমার বিচারক হওয়ার স্বপ্ন হয়তো বৃথা যাবেনা।আমি অনেক ভাল পরীক্ষা দিয়েছি।তুমি আমার জন্য দোয়া কর।” সে যথারীতি বড় ভাইয়ের রুমে অবস্থান করল। ৩ দিন পর হঠাৎ কক্সবাজার থেকে আলাউদ্দীন আল আজাদ স্যারের কাছ থেকে রুমের বড় ভাইয়ের ফোনে কল আসল। তখন আদিল পত্রিকা পড়ছিল। স্যার বলল“ আদিল তুমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খ ইউনিটে ০১ম স্থান অধিকার করেছ।”এ কথা শুনে আদিলের মনে হল সে যেন পৃথিবীতে স্বর্গ পেয়ে গেল! তখনই সে মাকে কল করে বলল “মা, তোমার ছেলে প্রথম হয়েছে”। মা সে দিন যে খুশি হয়েছিল হয়তো আদিলের জম্ম হওয়া নিয়ে এত খুশি হয়নি।

আদিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হওযার জন্য মনোনিত হল।কিন্ত ভর্তির টাকা নিয়ে আদিল এবং আদিলের মা অকুল পাথারে পড়লো।এমন সময় স্থানীয় সাংসদ জাতীয় পত্রিকায় আদিলের সম্পর্কে অবগত হয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। তার সাহায্যে আদিলের ভর্তি কার্যক্রম সম্পাদিত হল।ক্লাসের প্রথম দিন ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে যখন ড.রিদোয়ান স্যার আদিলকে জিজ্ঞাসা করলেন,“ ঢাবিতে এত বিষয় থাকতে তুমি আইন নিয়ে পড়তে চাচ্ছ কেন?”।তখন আদিল স্যারকে দশম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় স্থানীয় আদালতের ঘটনা ও মায়ের স্বপ্নের কথা বলল।স্যার তার কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনল এবং সেদিন থেকে স্যার তার সপ্ন পূরণে সহযোগিতা করতে লাগলেন।ইতোমধ্যে আদিলের সম্মান প্রথম বর্ষের ফলাফল প্রকাশিত হল। সে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হল। তখন থেকে সে তার বিভাগের সকল শিক্ষকের কাছে পরিচিত হয়ে গেল। এভাবে শিক্ষকদের সহায়তায় ৪ বছরের সম্মান কোর্স  শেষে ঢাকা বিশবিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হল। ফলাফল প্রকাশের পর মাকে জানানোর পর মায়ের দু নয়ন থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এই অশ্রু দুংখের নয়,এই অশ্রু আনন্দের। ইতোমধ্যে সে এল.এল.এম.  কোর্সে ভতি হল।

এরই   মাঝে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের সহকারী জজ নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হল। সে অন্যান্য চাকরী প্রার্থীদের মত আবেদন করল এবং স্বপ্ন পুরনের লক্ষ্যে পুরোদমে পড়াশোনা শুরু করল এবং পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে সে সাফল্য অর্জন করল। দেখতে দেখতে ১০ টি বছর কেটে গেল তার জীবন থেকে। এখন সে একজন খ্যাতিমান বিচারক| কিন্তু তার সপ্ন, সাহস যোগানোর যে রত্নধনটা তাকে আজীবন পরম মমতায় আগলে রেখেছিল, সেই মমতাময়ী মা আজ বেচে নেই।এতে তার দুংখ নেই কেননা জীবন-মৃত্যু মহান আল্লাহর হাতে।তবে তার দুংখ হল মা যদি আজ দেখতো তার ছেলে তার অনুপ্রেরণায় মানুষের মত মানুষ হয়ে কত মানুষের ইহকালের বিচার করছে।

মায়ের কবরের পাশে দাঁডিয়ে কান্না জডিত কন্ঠে আদিলের আকুতি,“মা তুমি দোয়া কর, তোমার ছেলে মানুষের মাঝে  যেন ন্যায় বিচার করতে পারে । স্মৃতিতে তুমি অমর হয়ে থাকবে, ধ্রুবতারা হয়ে পথ দেখাবে আমায় জীবনের বাঁকে বাঁকে।” কথাগুলো বলতে বলতে তার দুচোখ বন্ধ হয়ে আসল।তার দুচোখের কোণায়  সে অশ্রু আবিষ্কার করল।

লেখকঃ মোঃ আনোয়ারুল হাকিম (আরাফাত), সিনিয়র আইন কর্মকর্তা, অগ্রণী ব্যাংক লিমিটিড।

  • 45
    Shares

আপনার মতামত লিখুন :

গৌরনদীতে মহান বিজয় দিবস উদযাপন প্রস্তুতি সভা

গৌরনদীতে মহান বিজয় দিবস উদযাপন প্রস্তুতি সভা

ফজলুর রহমান বাবুর নতুন গান “চান্দে বসত কইরো কইণ্যা”

ফজলুর রহমান বাবুর নতুন গান “চান্দে বসত কইরো কইণ্যা”

বরগুনায় স্কুলের জমিতে শিক্ষকের বাগানবাড়ী।

বরগুনায় স্কুলের জমিতে শিক্ষকের বাগানবাড়ী।

শেখ হাসিনার উদ্যোগে ঘরে ঘরে বিদুৎ – এমপি শাহে আলম

শেখ হাসিনার উদ্যোগে ঘরে ঘরে বিদুৎ – এমপি শাহে আলম

বসুন্ধরা কিংস কাপের শুভ উদ্বোধন

বসুন্ধরা কিংস কাপের শুভ উদ্বোধন

বিনামূল্যে করোনার টিকা দেবে সরকার

বিনামূল্যে করোনার টিকা দেবে সরকার

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার: ApsNews24.Com (২০১২-২০২০)

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ নুরুন্নবী চৌধুরী সবুজ
01774-140422
প্রকাশকঃ আইনী পাঠশালা গ্রুপ
২২ চ্যামেলীবাগ (সিআইডি অফিসের পাশে) রমনা থানা, ঢাকা-১০০০।
01625-461876, 01771-784299
[email protected], [email protected]
Developed By Feroj

ব্রেকিং নিউজ