সব
facebook apsnews24.com
মহান বিজয় দিবসে ইবিতে মারামারির উৎস সন্ধানে একটি 'আনুমানিক' বিশ্লেষণ! - APSNews24.Com

মহান বিজয় দিবসে ইবিতে মারামারির উৎস সন্ধানে একটি ‘আনুমানিক’ বিশ্লেষণ!

মহান বিজয় দিবসে ইবিতে মারামারির উৎস সন্ধানে একটি ‘আনুমানিক’ বিশ্লেষণ!

▪️বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা আমাদের হতভম্ব করেছে। সেদিন কর্মকর্তাদের দুটি গ্রুপ এবং কর্মচারীদের দু’গ্রুপ ভিন্ন দু’টি মারামারিতে জড়িয়েছে। একে অপরকে অল্পবিস্তর আহতও করেছে। কর্মকর্তাদের বড় একটা অংশ বাঁশ- লাঠিসোঁটা নিয়ে মহড়া দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পার হয়ে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়ক এলাকাও দাবড়িয়ে বেড়িয়েছে তারা। মহড়াকালীন সময় আক্রমণাত্মক স্লোগান ও অশ্লীল গালাগালিও করেছেন অনেকে। তাদের নিভৃত করতে গিয়ে লাঞ্ছিত ও আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন বেশ ক’জন সিনিয়র-জুনিয়র শিক্ষক। এমনকি তাদের বাঁধার মুখে পড়েছেন পেশাগত দায়িত্ব পালনে থাকা সাংবাদিকরাও। পরে অবশ্য এনিয়ে ভুল স্বীকার করে ক্ষমাও চেয়েছেন। তবে, সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো- তাদের এসব কর্মকাণ্ডে শ্রদ্ধা নিবেদনের ফুল তছনছ করা হয়েছে এবং সেই ফুল পায়ে মাড়িয়েছেন উপস্থিত লোকজন। ছিঃ! এধরণের কথা লিখতেও লজ্জায় মাথা হেট হয়ে আসছে। যাহোক, এসবের মধ্যেই পালন হলো আমাদের বিজয়ের ৪৯তম দিবস। আর বিজয়ের আনন্দ এভাবেই ধুলোয় মিশিয়ে দিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় অতিউৎসাহী কর্মকর্তা-কর্মচারী।
০২.
ইবি’র ইতিহাসে নিঃসন্দেহে এটি একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইবে বহুকাল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মত স্থান থেকে জাতির সামনে এমন অসভ্যতা প্রদর্শন আমরা কেন করলাম? কেন নিজেদের জাত এভাবে আর এমন একটি দিনেই চেনালাম? আসলে, এর মূলে ছিল বিভাজন; ছিলো শুদ্ধাচারের অভাব, প্রগতি চর্চার অভাব; মূলে ছিলো মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হৃদয়ে ধারণে সীমাহীন গলদ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো- মারামারি যারা করেছেন তারা সকলেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির লেবেল নিয়ে চলেন; এমনকি মারামারির সময়ও ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিচ্ছিলেন উভয় পক্ষ। আর আজ তাদের হাতেই রচিত হল এই কলঙ্কিত অধ্যায়। গুণিজনরা বলেন, ‘স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন।’ এ মাটিরই সন্তান, যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে আমাদের এই স্বাধীন মানচিত্র উপহার দিয়ে গেলেন; অথচ দু’পয়সার দুটো ফুল দিতে গিয়েও আমরা একটু স্বার্থত্যাগ করে তাদের শ্রদ্ধা জানাতে পারি না! এর চেয়ে লজ্জার, এর চেয়ে অবমাননার আর কি হতে পারে!
০৩.
বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে এমন সংঘর্ষ, মারামারি, খামখেয়ালি শুধু ইবিতে নয়; দেশের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেছে। আমরা পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে তা দেখেছি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যানারে ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনের শহীদ মিনারের ছবি; ১৯৭১ সালের বিজয় দিবসের কর্মসূচিতে ব্যবহার করা হয়েছে। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে খোদ শিক্ষকরাই মারামারিতে জড়িয়েছেন। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিজয়ের তেমন কোনো উৎসব চোখে পড়েনি। এমনকি এদিন ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন না স্বয়ং উপাচার্যও। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় শিক্ষক আবার জাতীয় পতাকার মনগড়া ডিজাইন করে তা প্রদর্শন করেছে। এগুলো শুধু মিডিয়ায় চাউর হওয়া খবর। এর বাইরেও কত কান্ড যে হয়েছে; কে জানে তার খোঁজ! কিন্তু প্রশ্ন হলো- বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের মানুষজনের পরিমিতিবোধের এই হাল কেন? তারা কি নিজেদের সম্পর্কেই বে-ওয়াকিবহাল? কেন তারা এমন আগ্রাসী হয়ে উঠছেন? জাতির মহা আনন্দের এই দিনটিতে তারা কি আসলেই সম্মান জানাতে আসেন; নাকি এর পেছনে কোনো দূরাভিলাষীতা থাকে? এই সাইনবোর্ড ব্যবহার করে কি তাহলে নিজেদের হীন স্বার্থসিদ্ধির অপচেষ্টা থাকে তাদের? উল্লিখিত ঘটনাবলী তো অন্তত তারই প্রমাণ করে!
০৪.
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ঘটনা নতুন কিছু নয়। বিগত সময়েও এমন দেখা গেছে। তবে এবারের ঘটনার পেছনে আরও ঘটনা রয়েছে। মাত্র দু’দিন আগে (১৪ ডিসেম্বর) শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসেও একই ঘটনা সীমিত পরিসরে ঘটেছে। বিষয়টি সাংবাদিকরা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু, তাঁরা এ বিষয়ে প্রক্টর, দিবস বাস্তবায়ন কমিটি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আমি নিজেও উপাচার্য এবং উপ-উপাচার্যের সাথে ফোনে দীর্ঘক্ষণ আলাপ করে; তাদের বিষয়টি জানিয়েছি। এর পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সে বিষয়েও বলেছি। কিন্তু আগের দিন একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত পেয়েও; কেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরের দিনের ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না? বিষয়টি ভাববার।
০৫.
সবচেয়ে অবাক করেছে যে ঘটনা তা হলো- এই লজ্জাজনক ঘটনার ২৪ ঘন্টা পেরোলেও এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি গঠন হয় নি। আরও অবাক করা বিষয়- বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক প্রভাবশালী সংগঠন নিন্দা পর্যন্ত জানায় নি। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র মৈত্রী, জিয়া পরিষদ, সাদা দল বিবৃতি দিয়ে নিন্দা জানিয়েছে, বিচারও দাবি করেছে। যদিও পরে উল্লিখিত দল দু’টি চেতনার পাশাপাশি রাজনৈতিক কারণেও জানাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অন্যরা চুপ কেন? এটাতো কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয় বরং জাতীয় ইস্যু। বিজয়ের দিনে এমন ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের অপমান, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান, সর্বাধিনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধুরও অপমান। তারপরও তারা নিশ্চুপ থেকে কি এই অপমানের সম্মতি দিলেন? এখানে কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ দু’দফা মারামারি করে পরিবেশ নষ্ট করেছে। কিন্তু তাদের সবাই তো মারামারি করেননি। যারা করেননি, তাদেরও তো উচিত ছিলো, নিন্দা জানানো। এছাড়া, শিক্ষকদের ‘রঙিন’ সংগঠনগুলো কত বায়বীয় ঘটনাতেই তো নিন্দা-প্রতিবাদ-ক্ষোভে ফেটে পড়েন; তারাও তো পুষ্পস্তবক ভাঙা, বিজয় দিবসের শ্রদ্ধাঞ্জির ফুল পায়ে মাড়ানো, ক্যাম্পাসে লাঠিসোঁটা নিয়ে মহড়া দেয়ার ঘটনায় নিন্দা জানালেন না! তারা কি বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবেই নিচ্ছেন? স্বাধীনতার অতন্দ্র প্রহরী ছাত্রলীগের ইবি শাখা ঘুমিয়ে কেন? মহান বিজয়ের দিনে, নিজেদের ক্যাম্পাসে জাতির এই গৌরবময় আনন্দের দিনটি কারা ধুলিময় করে দিলো- তাদের চিহ্নিত করে বিচার দাবি কেন করলো না? নিন্দা-প্রতিবাদ কেন জানালো না? সবাই নিশ্চুপ! কিন্তু কেন এই নিরবতা? তাহলে কী ধরে নিতে হবে সবই একসূত্রে গাথা? কিম্বা কোথাও কী সবাই এক? এক হতে তো সমস্যা নেই। কিন্তু অবমাননাকর বিষয়ে এক হওয়া তো ভালো কোন লক্ষণ নয়, সমাজ প্রগতির লক্ষণ নয়। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির কাজও এমনতর হতেই পারে না।
০৬.
মাননীয় উপাচার্য বলেছেন, এটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে জড়িত কোনো বিষয় নয়, তাই তিনি এ নিয়ে কেনো মন্তব্য কিংবা ব্যবস্থা নিবেন না। জনসংযোগ দফতর থেকে পাঠানো তাঁর লিখিত বক্তব্যে তিনি এটাকে অনভিপ্রেত ঘটনা বলেছেন বটে; কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নিবেন কি না যে বিষয়ে এক অক্ষরও লেখেননি। কর্মকর্তাদের হাতে যে লাঠি ছিলো তাতে যদি কেউ হতাহত হত; তাও কি তিনি এ কথা বলতেন? বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে বহিরাগত ক্যাডার লাঠি নিয়ে প্রতিপক্ষের কর্মকর্তাদের তেড়ে বেড়াচ্ছেন তাতে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কি তিনি চুপ থাকতেন? শ্রদ্ধাঞ্জলির পুষ্পস্তবক ভেঙেছে, ফুল ছিঁড়েছে কিন্তু কোন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কি তিনি প্রশাসনের ঘটনা নয় বলে এড়িয়ে যেতেন? ঘটনা যদি এই হয় তবে ইবি’র নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ। তাহলে অনুমান করে বলা যায়, এই ঘটনা কেবল শুরু; শেষ কোথায় হবে আমরা বলতে পারি না। কোন পথে আমাদের প্রাণের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়?
০৭.
মোদ্দাকথা, বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা লেজুড়বৃত্তি করেন তারাই এই ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, প্রতিটি মানুষের একটি আদর্শ, একটি চেতনা থাকে, থাকতেই পারে। কিন্তু একজন পেশাজীবির সেটা হবে ব্যক্তিজীবনে। কোন সরকারি/বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়িত্ব পালন করতে এসে; সংগঠন করে চেতনা আদর্শের চর্চার কোনো প্রয়োজন নেই। এটা রাজনীতির জায়গাও নয়। আপনাকে সরকার পছন্দ করে নিয়েছে অফিসিয়ালি জাতির সেবা করার জন্য। সেই কর্মের বিপরীতে আপনাকে কমবেশি পয়সাও দেয়। সুযোগ সুবিধাদিও পান। আপনাকে দলীয় রাজনীতি করার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়নি। এক্ষণে, আপনার সবচেয়ে বড় চেতনা হবে আপনার চেয়ারে থেকে হাসিমুখে সততার সাথে সেবা দেয়া। এর মধ্যেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান চেতনা-আদর্শ রয়েছে। তাও যদি না বোঝেন, তাহলে বঙ্গবন্ধু ‘৭১ পরবর্তী ভাষণগুলো শুনে নিবেন। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের তিনি কেমন দেখতে চেয়েছেন, কি নির্দেশনা দিয়েছেন সেটা বুঝতে পারবেন। অফিস, চেয়ার ছেড়ে রাস্তায় মিছিল-মিটিং-পিকেটিং করার জন্য রাষ্ট্র আপনাকে নিয়োগ দেয়নি; জণগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতন দেয় না। আপনি মিটিং-মিছিল না করে; আমতলা, জামতলা, চা-স্টলে না ঘুরে যদি ৯টা-৫টা (অফিস আওয়ার) অফিসে বসে জণগণের সেবায় সময় দেন তাহলেই বুঝা যাবে আপনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করেন। আর এ জন্য জাতি আপনাকে স্যালুট জানাবে। মিছিল মিটিং করে সস্তা জনপ্রিয়তা কুঁড়াতে এসে নিজেকেও পঁচায়েন না; ওই চেয়ারটাকেও কদর্যময় কইরেন না। আমাদের সকলের বোধোদয় হোক, মুক্তিযুদ্ধের মৃতপ্রায় চেতনা জীবিত হয়ে ফিরে আসুক সবার মাঝে।▪️

অনি আতিকুর রহমান
সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী।

  • 149
    Shares

আপনার মতামত লিখুন :

দাম হাঁকিয়ে বিয়ে, অতঃপর তালাক!

দাম হাঁকিয়ে বিয়ে, অতঃপর তালাক!

১৪ ফেব্রুয়ারি মুক্তিকামী মানুষের গণতান্ত্রিক চেতনার দিন : ন্যাপ

১৪ ফেব্রুয়ারি মুক্তিকামী মানুষের গণতান্ত্রিক চেতনার দিন : ন্যাপ

আত্মহত্যা কারা করে, কেনো করে?

আত্মহত্যা কারা করে, কেনো করে?

ভূমি মালিকানার সীমা পরিসীমা

ভূমি মালিকানার সীমা পরিসীমা

ছেলে শিশু ভিকটিমঃ ধর্ষণ, নাকি না? বাংলাদেশের আইন ও সংজ্ঞাগত জটিলতা

ছেলে শিশু ভিকটিমঃ ধর্ষণ, নাকি না? বাংলাদেশের আইন ও সংজ্ঞাগত জটিলতা

চার্জ গঠন করার পূর্বে মুক্তি

চার্জ গঠন করার পূর্বে মুক্তি

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার: ApsNews24.Com (২০১২-২০২০)

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ নুরুন্নবী চৌধুরী সবুজ
01774-140422
প্রকাশকঃ আইনী পাঠশালা গ্রুপ
২২ চ্যামেলীবাগ (সিআইডি অফিসের পাশে) রমনা থানা, ঢাকা-১০০০।
01625-461876, 01771-784299
[email protected], [email protected]
Developed By Feroj

ব্রেকিং নিউজ