আদালতে মিথ্যা ও হয়রানীমূলক মামলার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। বিচার প্রক্রিয়ায় জট বৃদ্দির অন্যতম কারন এটি। আদালত তার কার্যক্রমে মিথ্যা মামলা যেমন সঠিক ভাবে নির্ণয় করে তেমন মিথ্যা মামলাকারী প্রতি আইনত ব্যবস্থাও গ্রহণ করে।
ঝিনাদহের যুগ্ম জেলা জজ আদালত ( ২ ) এর বিজ্ঞ বিচারক জনাব মাসুদ আলীর আদালতে সাম্প্রতিক সময়ে এরকম একটি প্রতারণার মিথ্যা মামলা আসলে সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয় ও বাদীর নামেও মামলা করার হয়।
জনসচেতনতার জন্য মামলার অদ্যোন্তপান্ত এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো:
মোকামঃ বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, ১নং আমলী আদালত (ঝিনাইদহ সদর),ঝিনাইদহ।
অভিযোগকারী আসামী সাক্ষী
ঘটনার তারিখ ও সময়ঃ ২২/০৭/২০১৮ খ্রিঃ তারিখ হতে ৩০/০৭/২০১৮ খ্রিঃ তারিখের মধ্যে যে কোন সময়।
ধারাঃ পেনাল কোডের ৪৬৫/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১ ধারা।
অভিযোগকারীর নালিশের বিবরণ এই যে, আসামী মোছাঃ রহিমা খাতুন সেশন ৪৭/২০১৯ {ঝিনাইদহ সি.আর-৮১৭/২০১৮ নং মামলা হতে উদ্ভুত}নং মামলার অভিযোগকারী ছিলেন। এই মামলার ৩ নং সাক্ষী মোছাঃ রুপালী খাতুন উক্ত মামলার আসামী ছিলেন। উক্ত মামলার অভিযোগকারী অর্থাৎ এই মামলার আসামী মোছাঃ রহিমা খাতুন উক্ত মামলার আসামী অর্থাৎ এই মামলার ৩ নং সাক্ষী মোছাঃ রুপালী খাতুন কে কিছু টাকা সুদে ধার দিয়েছিলেন এবং সুদে-আসলে ১,৪৫,০০০/=(এক লক্ষ পঁয়তাল্লিশ হাজার) টাকা আসামীর নিকট হতে গ্রহণ করেছিলেন। টাকা ধার দেওয়ার সময় উক্ত মামলার অভিযোগকারী মোছাঃ রহিমা খাতুন উক্ত মামলার আসামী মোছাঃ রুপালী খাতুন এর নিকট হতে একটি ব্লাংক চেক রেখেছিলেন। উক্ত চেকে ৭,৫০,০০০/=(সাত লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা এবং ২২/০৭/২০১৮ খ্রিঃ তারিখ বসিয়ে এই মামলার আসামী মোছাঃ রহিমা খাতুন উক্ত মামলাটি দায়ের করেছিলেন। উক্ত মামলার অভিযোগকারী তার ধার দেওয়া টাকা উক্ত মামলার আসামী মোঃ রুপালী খাতুন এর নিকট হতে সুদে আসলে ফেরত নেওয়া সত্বেও উক্ত মামলার আসামীকে ফাঁকা চেকটি ফেরত না দিয়ে অন্যায়ভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে ফাঁকা চেকে টাকার অংক ও তারিখ বসিয়ে উক্ত মামলাটি দায়ের করেছিলেন।
উক্ত মামলার অভিযোগকারী ও আসামীর মধ্যে ১৫০/= টাকার নন জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে একটি অঙ্গীকার নামা সম্পাদন হয়েছিল। অঙ্গীকারনামাটি উক্ত মামলায় প্রদশর্নী ‘ক’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উক্ত অঙ্গীকারনামার ২য় পক্ষ মোছাঃ রহিমা খাতুন উক্ত মামলার অভিযোগকারী এবং অঙ্গীকারনামার ১ম পক্ষ মোছাঃ রুপালী খাতুন উক্ত মামলার আসামী। অঙ্গীকারনামার ২য় পক্ষ তথা উক্ত মামলার অভিযোগকারী মোছাঃ রহিমা খাতুন উক্ত অঙ্গীকারনামায় শপথ পূর্বক ঘোষনা করেন “আমি ২য় পক্ষ এই মর্মে শপথ পূর্বক ঘোষনা করিতেছি যে, আমি ১ম পক্ষের নিকট লাভ হিসাবে কিছু টাকা দিয়াছিলাম। তাহার লভ্যাংশ সহ ১,৪৫,০০০/= টাকা অদ্য গ্রহণ করিলাম। ইতিপূর্বে উক্ত টাকা লেনদেন নিয়ে কিছু মনোমালিন্য হওয়ায় ১ম পক্ষের দেওয়া ব্লাইং চেক দ্বারা ১ম পক্ষের নামে একটি মামলা করি। যাহার নং- ঝিঃ সি.আর- ৮১৭/১৮। বর্ণিত টাকার বিনিময়ে অদ্য উভয় পক্ষের মধ্যে কলহ মিমাংসা হইল। ১ম পক্ষের দেওয়া চেকটি বিজ্ঞ আদালতে জমা থাকায় অদ্য ফেরৎ দিতে পারিলাম না। তাই পরবর্তীতে মামলা তুলিয়া লইয়া চেকটি ফেরৎ দিব বলিয়া অঙ্গিকার করিলাম।”
উক্ত মামলার অভিযোগকারী অঙ্গীকারনামায় থাকা তার স্বাক্ষর অস্বীকার করেন এবং তার নিয়োজিত বিজ্ঞ আইনজীবীর মাধ্যমে গত ২৭/০১/২০২০ খ্রিঃ তারিখে লিখিত দরখাস্ত দ্বারা অঙ্গীকারনামায় থাকা উক্ত মামলার অভিযোগকারীর স্বাক্ষর জাল মর্মে দাবী করে ঊীঢ়বৎঃ কর্তৃক পরীক্ষার আবেদন করেন। আদালত কর্তৃক আবেদন মঞ্জুর করা হয়।
উভয়পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীদের উপস্থিতিতে আদালতের সম্মুখে অভিযোগকারীর ১০ টি নমুনা স্বাক্ষর গ্রহণ করা হয়। অভিযোগকারী রহিমা খাতুনের তর্কিত অঙ্গীকারনামায় থাকা দুইটি স্বাক্ষর ‘ঢ’ সিরিজ হিসেবে, নালিশী দরখাস্ত, ওকালত নামা ও জবানবন্দিতে থাকা রহিমা খাতুনের স্বীকৃত স্বাক্ষর সমূহ ‘ণ’ সিরিজ এবং আদালতের সম্মুখে গৃহীত অভিযোগকারীর ১০ টি নমুনা স্বাক্ষর ‘ত’ সিরিজ হিসেবে চিহ্নিত করে স্বাক্ষরগুলির মধ্যে মিল আছে কিনা তা তুলনামূলক পরীক্ষা করে প্রতিবেদন প্রদানের জন্য পুলিশ পরিদর্শক, হস্তলিপি বিশারদ, সিআইডি, বাংলাদেশ পুলিশ, ঢাকা বরাবর প্রেরণ করা হয়। স্বাক্ষরগুলির তুলনামূলক পরীক্ষা শেষে বিশেষ পুলিশ সুপার (ফরেনসিক) বাংলাদেশ পুলিশ, সিআইডি, ঢাকা হতে ২৫/০৩/২০২০ খ্রিঃ তারিখের ফরেনসিক ল্যাবঃ (ঢাকা)/হস্তলিপি শাখা/ ঐড-২-০১৩১-২০২০/০৯৩৬/২০২০ নং- স্মারক মূলে হস্তলিপি বিশারদের মতামত পাওয়া যায়। বাংলাদেশ পুলিশ, সিআইডি, ঢাকা হতে প্রাপ্ত রিপোর্টে হস্তলিপি বিশারদ এই মর্মে মতামত প্রদান করেন যে, চূড়ান্ত পরীক্ষান্তে রহিমা নামীয় ু,ু-১ হতে ু-৫ চিহ্নিত প্রামাণ্য ও ু,ু-১ চিহ্নিত নমুনা স্বাক্ষরগুলোর সাথে রহিমা নামীয় ী,ী-১ চিহ্নিত বিতর্কিত স্বাক্ষরটির ‘মিল’ পাওয়া গেছে।
উক্ত মামলার আসামীপক্ষ হতে দাখিলকৃত ও প্রদশর্নী ‘ক’ হিসেবে চিহ্নিত অঙ্গীকারনামা, হস্তলিপি বিশারদের রিপোর্ট এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য থেকে আদালতের নিকট এটা স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ যে, উক্ত মামলার অভিযোগকারী মোছাঃ রহিমা খাতুন উক্ত মামলার আসামী মোছাঃ রুপালী খাতুন কে কিছু টাকা সুদে ধার দিয়েছিলেন এবং সুদে-আসলে
১,৪৫,০০০/=(এক লক্ষ পঁয়তাল্লিশ হাজার) টাকা আসামীর নিকট হতে গ্রহণ করেছিলেন। টাকা ধার দেওয়ার সময় উক্ত মামলার অভিযোগকারী উক্ত মামলার আসামী মোছাঃ রুপালী খাতুন এর নিকট হতে একটি ব্লাংক চেক রেখেছিলেন। উক্ত চেকে ৭,৫০,০০০/=(সাত লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা এবং ২২/০৭/২০১৮ খ্রিঃ তারিখ বসিয়ে এই মামলার আসামী মোছাঃ রহিমা খাতুন উক্ত মামলাটি দায়ের করেছিলেন। উক্ত মামলার অভিযোগকারী তার ধার দেওয়া টাকা উক্ত মামলার আসামী মোঃ রুপালী খাতুন এর নিকট হতে সুদে আসলে ফেরত নেওয়া সত্বেও উক্ত মামলার আসামীকে ফাঁকা চেকটি ফেরত না দিয়ে অন্যায়ভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে ফাঁকা চেকে টাকার পরিমাণ ৭,৫০,০০০/=(সাত লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা ও তারিখের ঘরে ২২/০৭/২০১৮ খ্রিঃ তারিখ বসিয়ে চেকটি ৩০/০৭/২০১৮ খ্রিঃ তারিখে ব্যাংকে উপস্থাপন করে ডিজঅনার করিয়ে উক্ত মামলাটি দায়ের করেছিলেন। চেকে তারিখের ঘরে ২২/০৭/২০১৮ খ্রিঃ তারিখ উল্লেখ থাকায় এবং চেকটি ৩০/০৭/২০১৮ খ্রিঃ তারিখে ব্যাংকে উপস্থাপন করায় প্রতীয়মান হয় যে, আসামী মোছাঃ রহিমা খাতুন ২২/০৭/২০১৮ খ্রিঃ তারিখ হতে ৩০/০৭/২০১৮ খ্রিঃ তারিখের মধ্যে যে কোন সময় জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটিয়েছেন এবং জালিয়াতির মাধ্যমে টাকার অংক ও তারিখ বসানো চেকটি ব্যাংক এবং আদালতে খাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
উক্ত মামলার অভিযোগকারী তথা এই মামলার আসামী মোছাঃ রহিমা খাতুনের এহেন কার্যকলাপ পেনাল কোডের ৪৬৫/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১ ধারার অপরাধের আওতায় পড়ে।
সেশন ৪৭/২০১৯ {ঝিনাইদহ সি.আর-৮১৭/২০১৮ নং মামলা হতে উদ্ভুত} মামলার রায়ে এই মামলার আসামী মোছাঃ রহিমা খাতুন কর্তৃক ফাঁকা চেকে টাকার অংক ও তারিখ বসিয়ে জালিয়াতি করার বিষয়টি সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
অতএব, বিজ্ঞ আদালতের নিকট প্রার্থনা এই যে, আসামীর বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৪৬৫/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১ ধারার অপরাধ আমলে নিয়ে তার বিরুদ্ধে ড/অ এর আদেশ দানে মর্জি হয়। ইতি- তাং ০১/১০/২০২০ খ্রিঃ।


