স্বাধীনতার পর রেলখাত বরাবর ক্ষতির সম্মুখীন কখনো লাভের মুখ দেখেনি। গত অর্থবছরেও রেলে পরিচালনা লোকসান (অপারেটিং লস) ১ হাজার ২৮০ কোটি টাকা । টাকার অংকে বিশেষ করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় এই পরিমাণ মোটেই কম নয়।
গত ১০ বছরে বিদ্যুৎ খাতে পিডিবি’র লোকসান ৫৮ হাজার কোটি টাকা। গড় হিসাব করলে বছরে লোকসানের পরিমান প্রায় ৬ হাজার কোটি যদিও এ হার ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। লস হলেও এর গুরুত্ব বিবেচনায় এখনও এ খাত টিকে আছ ও বন্ধও হয়ত হবে না। ডিজিটাল বাংলাদেশের যে স্বপ্ন বিদ্যুৎ চাহিদ পূরণ না করতে পারলে তা পূরণ করা সম্ভব না।
উপরের খাতগুলোর মত সরকারের নানা সেবামূলক খাত আছে যার আয় ব্যয় দেখলে যে কারো রক্ত গরম হতে পারে। পাবনার বালিশ কান্ড বা ফরিদপুর হাসপাতালে দূর্নীতি যে কারো ভিতর উত্তেজনা তৈরী করে যদিও ব্যক্তি বিশেষে প্রতিবাদের ভাষা ভিন্ন ভিন্ন। সেবাখাতগুলো যখন দূর্নীতিতে ছেয়ে গেছে তখনো কিন্তু খাতগুলো বন্ধ করার কথা কেউ বলছি না বা বলা উচিতও না। এই খাতগুলো কারো জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার কিন্তু দেশের জন্য আবশ্যকীয়। তাহলে এখানে কথা আছে বিচার বিভাগও যদি সেবা দেয় তাহলে তার সরকারীকরণ কতদূর হয়েছে বা এর সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের জীবন জীবিকার নিশ্চয়তা কতটুকু আছে।
শিক্ষা অর্জন শেষে তা সমাজের কাজে লাগানোর সুযোগ ও তার জন্য পরিবেশ নিশ্চিত করা কিন্তু রাষ্ট্রের দ্বায়িত্ব। যে যে স্থানের যোগ্য তাকে সে স্থানে যাবার সুযোগ অবশ্যই দিতে হবে। শিক্ষা অর্জন শেষে যদি ভিক্ষা অর্জন করে চলতে হয় তাহলে তো তার জাতির জন্য লজ্জার। যুবকদের যেীবনকাল বড় ধরণের কোন সৃজনশীল কাজে ব্যয় না হয় তবে তার খেসারত রাষ্ট্রেকে দিতেই হবে। শিক্ষা থেকে কর্মজীবনে প্রবেশের জন্য যে দীর্ঘসূত্রীতা তা একজন যুবকের যেীবনকালটাই শুধু নষ্ট করে না তা দেশের উন্নয়নের জন্যও বাধা। এই বাধা শিক্ষানবিশ আইনজীবীদেরও জন্য খুবই ভয়াবহ।
আইন পাশ করার পর ইন্টিশেন জমা দিতে হয়। তারপর ৬ মাস ইন্টার্নী মেয়াদ শেষ করে পরীক্ষা দেবার যোগ্যতা অর্জন করা যায়। সেটা আবার যেমন তেমন পরীক্ষা নয়। তিন ধাপের খুব কড়া ও সময় সাপেক্ষ পরীক্ষা। আবার সে পরীক্ষাও যদি সঠিক সময়ে হতো তা না হয় কথা ছিলো। একজন শিক্ষার্থী যখন আইনের উপর ৪ বছর, ৩ বছর, বা ২ বছর পড়ে ও আদালত প্রাঙ্গনে ৬ মাস বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করে তার পরেও যদি তাকে অনিশ্চিত বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তবে তা একজন সম্ভাবনাময় যুবক-যুবতীর জন্য বেশ হতাশার।
রেল বা বিদ্যুত বা অন্যান্য খাতগুলো যদি সরকারকে লোকসান দেওয়ার পরও টিকে থাকে তাহলে বিচার বিভাগকে বাচাতে তার পুরোপুরি জাতীয় করণ করলে সেটি মন্দ কিছু হয় না। মুহুরী থেকে শুরু করে আইনজীবী ও বিচারক সবই হবে সরকারী কর্মচারী। মামলার অতিরিক্ত খরচের জন্য যারা মামলা করতে চায় না তখন তা আর থাকবে না। মামলার দীর্ঘসূত্রীতাও কমে যাবে। কাজের গতি ও বিচার বিভাগের স্বাত্রন্ত্র্যও বজায় থাকবে। চাইলে এই কাজটিও করা যায়।
একজন সদ্য পাশ করা আইনের শিক্ষার্থী যখন মুখস্ত বিদ্যার জোরে বিচাররক হয় ও বিচার করতে এজলাসে বসেন তখন ১০ বা ২০ বছরের অভিজ্ঞ লোকটি তাকে সমীহ করে। অন্যদিকে আইনজীবী হবার স্বপ্ন দেখে একজন শিক্ষানবিশ আইনজীবি সারাদিন তার সিনিয়রকে সময় দিয়ে ১০০ বা ক্ষেত্র বিশেষে ২৫০ টাকা পাচ্ছে যেখানে একজন মজুরী পায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। এতো শিক্ষার মূল্য কি সব মূল্যহীন? এখন যারা পরীক্ষার দীর্ঘসূত্রীতা ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও টিকে থাকার লড়াই করে তারা কতটা মানসিক ক্লেস নিয়ে পরবর্তীতে এই পেশা চলমান রাখে সেটাও ভাববার বিষয়।
আদালতে মামলার যেমন অভাব নেই তেমন মামলা জট প্রকট। বিচারক স্বল্পতার জন্যও শুধু নয় ভালো আইনজীবীর অভাবেও মামলা জট হচ্ছে ও হবে। জীবন ধারনের জন্য যখন টাকার দরকার ও তাতে অনিশ্চয়তা আছে তখন আইনজীবীরা তাদের আয়ের উৎস ধরে রাখার জন্যও মামলার দীর্ঘসূত্রীতা বাড়াতে পারে।আবার প্রচলিত যেভাবে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে তাতে ইচ্ছা থাকলেও অনেকেই আইন পেশায় আসে না তার কারনে অনেক মেধাবীকে হারাতে হয়। উৎসাহী, উদ্যোমী মেধাবীর পরিবর্তে এমন কিছু লোক হয়ত উকালতি পেশায় আসে যাদের উকালতি পেশায় আসা উচিত হয় নি।
দীর্ঘদিন আইন যারা পড়লো ও যারা পড়ালো তাদের যোগ্যতাকে পরোক্ষভাবে অবজ্ঞা করে এমন সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই সুখকর নয়। আইনজীবী হবার জন্যও যদি এতো দীর্ঘসূত্রীতা মূলক কঠোর পরীক্ষা দিতে হয় তবে শিক্ষা পদ্ধতির গলদকে প্রকাশ করে। আইন শিক্ষার পদ্ধতি ও সিলেবাসে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন হলে তা করতে হবে। ক্লিনিক্যাল শিক্ষার যদি প্রয়োজন হয় তা চালু করার দ্বায়িত্ব যাদের তারা যদি তা না করে বছরের পর বছর সাধারণ শিক্ষার্থীর উপর দায় দেয় তাহলে তা কখনোই মানবতার পর্যায়ে পড়ে না। এই শিক্ষা পরিবর্তনগুলো যারা শিক্ষানীতি তৈরী করেন তারা দায় নিয়ে শিক্ষার্থীদের অবশ্যই করা উচিত। প্রতি বছর শুধু পাসের সংখ্যার সাথে যে কিছু হতাশাগ্রস্ত যুবকের সংখ্যাও বাড়ে সে পরিসংখ্যানও রাখতে হবে।
২০০৭ সালে বিচার বিভাগ কে আলাদা করা হয়। বিসিএস থেকে বিচার নামের ক্যাডারকে আলাদা করে বিজেএস নাম দিয়ে সেখানে শুধু আইনের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেবার ব্যবস্থা করা হয়। শুধু এতোটুকুর মধ্যে কি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সীমাবদ্ধ? এই বিভাগের সাথে যারা জড়িত তাদের যদি অর্থনৈতিক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায় তাহলে বিচার বিভাগের যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তাতে বিচ্যুতি ঘটতেই পারে। সরকারী চাকুরীজীবীদের বেতন কাঠামো আছে। তাদের বেতনও বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু তাদের সেবার মান নিয়ে কি সবাই সন্তুষ্ট? সমাজে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা শান্তি ও সমৃদ্ধি আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিচার বিভাগ কিন্তু এই বিভাগে যদি মনোযোগ রাখা না হয় তাহলে তাতে ভয়াবহ কিছু ঘটতেই পারে।
আইনজীবীরা তাদের নিজস্ব দরদামের মাধ্যমে মামলার খরচ বা তার পারিশ্রমিক নিতে পারে। অজ্ঞতার সুযোগ নিয়েও নানা সময় মামলার পক্ষের উপর অর্থের অতিরিক্ত চাপ দেয় কেউ কেউ। আদালতে দালাল, ভুয়া আইনজীবী বা বিচারক সংকটগুলো বিচার বিভাগকে তার নিজস্ব উচ্চতায় পেীছে দিতে বাধার সৃষ্টি করছে। এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য যথাযথ কতৃপক্ষের ভাবনা ও চিন্তা কি তা নিয়ে যতেষ্ট সন্দিহান আছে। বিচার বিভাগ ও ভালো আইনজীবীর গুরুত্ব অনুধাবন করে হলেও আইনজীবী সনদ প্রক্রিয়ায় পদ্ধতিতে সময় উপযোগী চিন্তা তার করতে পারতো আর তা করলে আজ আইনজীবী সনদ ‘অধিকার আন্দোলন’ নামে সংগঠন করার প্রয়োজনীয়তা বা বাস্তব প্রেক্ষাপট তৈরী হতো না।
‘আইনজীবী সনদ অধিকার আন্দোলন’ অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। নিজের আইনে পড়ে নিজের অধিকার নিয়ে যদি কথা বলতে ও কাজ করতে না পারি তাহলে অন্যদের অবস্থা তো আরো করুন। জানার পরে তো তার প্রতিকারের জন্য প্রতিরোধ করতে হবেই। শিক্ষা পদ্ধতিতে সমস্যা থাকলে তার দায় কতৃপক্ষের তার জন্য একজন শিক্ষার্থকে কেন এতো ভুগতে হবে। একটা নিদৃষ্ট সময় ধরে আইনের উপর পড়াশুনা করে ডিগ্রী অর্জন করতে হয়। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে যদি সেই ডিগ্রীর যথাযথ মূল্য না দেওয়া হয় ও শিক্ষা পদ্ধতিতে সংকট বা অন্য কোন কারন দেখানো হয় তাহলে যারা এই কারনগুলোর জন্য দায়ী তাদের দায়ভার নিতে হবে।
কেন প্রয়োজন?
১. যোগত্যার জন্য প্রশিক্ষণ ও ব্যবহারিক পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে দীর্ঘ সূত্রীতামূলক অনিয়মিত পরীক্ষা নয়।
২. শিক্ষা ও শিক্ষা পদ্ধতিতে যদি সমস্যা হয় তাহলে তা সমাধান না করে বছরের পর বছর শিক্ষার্থীদের সাথে এমন অমানবিক আচরণ মোটেই কাম্য নয়। আগের কাজটা আগে ঠিক করতে হবে, শিক্ষার্থীর উপর দায় কেন হবে।
৩. জীবনের যেীবনকালীন সময় যদি বিরক্তি আর হতাশার মাঝে যায় তবে তা জাতির জন্যও ক্ষতিকর। শিক্ষা ও প্রিয় কর্মক্ষেত্রে যাবার জন্য যোগত্যার প্রমাণ আমরা দিতে চাই।
৪. যেখানে একজন শ্রমিক মজুরী পায় ৪০০+ সেখানে একজন শিক্ষনবিশ আইনজীবী কিভাবে ১৫০+ মজুরী নিয়ে তাদের জীবন ও জীবিকা নির্বাহ করবে। বিশেষ করে যারা ভাড়া বাসায় বসবাস করে। এদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা কেন নয়?
৫. পরীক্ষা যদি ছাটাই ও যোগ্যদের বাছাই করার জন্য হয় তবে শিক্ষনবিশদেরও আলাদতে শুনানি করার অনুমতি দিতে হবে ও তারা কোন কোন মামলার শুনানি করতে পারবে তা নিদৃষ্ট করে দেয়া যেতে পারে। মামলার সাফল্যের উপর তার পূর্ণাঙ্গ আইনজীবী হবার সুযোগ তৈরী হবে।
৬. অধস্তন আদালতের বিচারক হবার জন্য অন্তত: ২ বছর আদালতে আইনজীবী হয়ে মামলা লড়ার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
৭. সময়ের প্রয়োজনে উপজেলা আদালত আবার চালু করা প্রয়োজন। আদলত ও ন্যয় বিচার সাধারণের দ্বারে দ্বারে পেীছে দিয়ে সামাজিক শান্তি ও নিরাপত্তা আরো জোরদার করা সম্ভব হবে এর মাধ্যমে।
শরীরে রোগ হলে তার চিকিৎসা করাতে হবে কিন্তু তার জন্য যদি কেউ আত্মহত্যা করে বা চিকিৎসা করার সুযোগ না দিয়ে আত্মহত্যা করার পরিবেশ তৈরী করে দেয় তবে সে আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী। হাজার হাজার আইনের শিক্ষার্থীর আজ আত্মার মরণ হচ্ছে। ইচ্ছা থাকলেও দীর্ঘসূত্রীতা মূলক পরীক্ষা ও অনিশ্চিয়তা আজ গ্রাস করছে তাদের। যোগ্যতা প্রমাণ দেবার জন্য তারা প্রস্তুত থাকলেও আপনার তো কি প্রমাণ নেবার জন্য প্রস্তুত? প্রস্তুত যে না তা তা সাক্ষ্য আইনের ৮ ধারার আলোকেও বলা যায়। তাই নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে ও অধিকার সচেতন হয়ে অধিকার ফিরে পেতে ‘আইনজীবী সনদ অধিকার আন্দোলন’-এ যুক্ত হই ও এই আন্দোলনকে বেগবান করি।
নূরুন্নবী সবুজ
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ (ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়)।
সংগঠক
আইনজীবী সনদ অধিকার আন্দোলন, ( ইবি) ।


