আমাদের তরুণ সমাজ জাতির আশা-ভরসার কেন্দ্রস্থল। জাতীয় জীবনে যে কোন মুহূর্তে তরুণ সমাজ অগ্রণী এবং সাহসী ভূমিকা পালন করতে পারে। বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকার, মহান মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলনসহ দেশের বিভিন্ন সঙ্কট উত্তাল দিনে ও দেশবাসীকে তারা আশা, ভরসা, শক্তি,এবং প্রতিভা দিয়ে, প্রেরণা জুগিয়েছে।
আমাদের তরুণ সমাজই ভবিষৎ জাতির প্রাণশক্তি, উন্নয়ন ও অগ্রগতির প্রধান নিয়ামক। তারা সাহসী, গতিশীল প্রতিশ্রুতিশীল, সম্ভাবনাময় এবং সৃজনশীল। তরুণদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সাহস, কর্মস্পৃহা ও কর্মক্ষমতা দেশ ও জাতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশে মানুষের জীবন যাএার মান অনেক উন্নত হয়েছে। এই জীবন যাএার মান উন্নত হয়েছে প্রতিশ্রুতিশীল,সম্ভাবনময় ও সাহসী আমাদের তরুন সমাজের কারণেই। তরুনরাই আমাদের সমাজের বড় সম্পদ। কিন্তু বর্তমানে তরুনরা তাদের শক্তি,মেধা গুলো হারিয়ে ফেলছে। কেন জানি তারা আর তাদের অদম্য সাহস গুলোকে কাজে লাগাতে পারছে না।
কাজে না লাগার অনেক কারণ আছে। বর্তমানে বাংলাদেশে তরুণ প্রজন্মের সংখ্যা অনেক বেশি৷ এরাই যেহেতু দেশ গড়ার কারীগর,আগামী দিনের কর্ণধার, তাহলে এদেরকে নিয়ে আলাদা করে ভাবা দরকার। তাদের বিকশিত হওয়ার জন্য সবকিছু করা দরকার।
তরুণদের শৈশব থেকেই সেভাবে গড়ে তুলতে হবে। কোনো পরিবারে যখন কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করে। জন্মগ্রহণ করার পর শিশুটা আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে। তখন তার বয়সের সাথে তাকে তার মুক্তচিন্তা করার সুযোগ করে দেয়া। পরিবারে উচিত যতটা সম্ভব তাকে পরিবারে সকল বিষয় চিন্তা করার সুযোগ করে দেয়া।
তখন ঐ তরুন নিজেকে নিয়ে ভাবতে শুরু করবে । যখন সে নিজেকে নিয়ে ভাবতে শুরু করবে সে কি করতে চায়, সে কি হতে চায়, সে কি খেতে চায়, সে কি পড়তে চায় সেগুলো বিষয়ে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভাবা উচিত। তার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দেয়া উচিত। জোর করে তাকে কিছু চাপিয়ে না দিয়ে। সে তার পরিবার, সমাজ,ও দেশের জন্য কি করতে চায় তাকে সেগুলো বিষয়ে ভাবার সুযোগ করে দেয়া। পরিবারের কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নীতিমালা গ্রহণ করতে গেলে তরুণদের পছন্দ, প্রয়োজন ও ইচ্ছাকে গুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে৷ ঠিক পরিবারের মতো সমাজ ও দেশের উচিত তরুন বা যুব সমাজের ইচ্ছা শক্তি গুলোকে কাজে লাগানো।
আমাদের সমাজের মানুষের মেন্টালিটি এমন হয়ে গেছে তারা তাদের ইচ্ছা শক্তি গুলোকে যুব সমাজের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে। তরুণ রা তারা তাদের স্বপ্নকে হারিয়ে ফেলছে তারা আর তাদের কাঙ্খিত লক্ষে পৌছাতে পারছে না।
একটা পরিবারে যখন সন্তান জন্ম গ্রহণ করে।তখন পিতামাতা স্বপ্ন দেখা শুরু করে তার সন্তান ডাক্তার, ইন্জিনিয়া,বিসিএস ক্যাডার হবে। কিন্তু ঐ সন্তানটি যখন বড় হয় তখন তো তার একটা আশা থাকে সে কি হবে। সে তো একজন ভালো খেলোয়াড়,শিল্পী, গায়ক,লেখক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, কৃষক হতে পারে। এগুলো তার স্বপ্ন হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে অনেক জরিপে দেখা গেছে অনেক মা বাবা তাদের স্বপ্ন গুলো বাস্ববায়নের জন্য সন্তানের উপর অনেক শারীরিক ও মানসিক চাপ প্রয়োগ করে। ফলে ঐ সন্তান বা তরুণসমাজের স্বপ্ন গুলো মাটির সাথে মিশিয়ে যায় আবার তারা যখন তাদের বাবা মার স্বপ্ন গুলো পূরণ করতে ব্যর্থ হয় তখনেই নেমে আসে তরুণ সমজের হতাশা আর ব্যর্থতা।
বর্তমানে আমাদের তরুণ সমাজের মধ্যে দেশ নিয়ে, সমাজ নিয়ে, একধরনের হতাশা কাজ করছে। এর পিছনে অনেক কারণে রয়েছে যেমন এর পেছনে বেকারত্ব, সুযোগের অভাব, উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর চাকরি না পাওয়া, সঠিক কর্মসংস্থান না পাওয়ার হতাশা ইত্যাদি । আবার দুর্নীতি, অনিয়ম, ন্যায়বিচার, সুশাসনের অভাব ইত্যাদিও তরুণ সমাজকে হতাশার জন্ম নেয়।
আমদের তরুণরাই আমাদের দেশকে স্বাধীন করেছে। তাদের অদম্য শক্তি দিয়ে। কিন্তু সেই তরুণ সমাজের শক্তি সাহস গুলো আর নেই। আমরা আমাদের তরুণসমাজকে ১৯৫২, ১৯৬৯ ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের মতো দেখতে চাই। রাজনৈতিক ফায়দা আর বৈষয়িক সুবিধাদি প্রাপ্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখতে চাই না।আমরা সেই জাগ্রত তরুণকে দেখতে চাই।তরুণ সমাজকে জাতীয় ঐক্যের, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ী এবং স্বকীয় সত্তা বিকাশের আঙ্গিকে দেখতে চাই।
আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে, দেশের কর্ণধার কারা হবে দেশ কিভাবে চলবে। তা নির্ভর করবে আমাদের তরুণ সমাজের মনমানসিকতা আর নৈতিক মূল্যবোধের ওপর। কারও দ্বারা প্রভাবিত বা ব্যবহৃত হয়ে দিগ্ভ্রষ্ট হলে জাতির ভবিষ্যৎ সংকটময় হবে। সে কারণে তরুণ সমাজের কাছে অনুরোধ যে, তারা যেন স্বজনপ্রীতির রাজনীতি বাদ দিয়ে স্বকীয়তা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে নিজেদের জীবন গড়ার চেষ্টা করে। তা না হলে আমরা যে তরুণ সমাজকে নিয়ে ভবিষ্যতের সুন্দর স্বপ্ন দেখছি, তা স্বপ্নই থেকে যাবে।
আমাদের তরুণদের সঠিক পথে পরিচালিত করার দায়িত্ব সমাজ এবং রাষ্ট্রের । দেশের রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে মুক্তচিন্তা করার তরুণ সমাজ গড়ে তুলতে হবে। এই মুক্তচিন্তার পরিবেশ তৈরী করতে না পারলে একটি জাতি কখনোই বিকশিত হতে পারবে না। তরুণেরাই রাষ্ট্রের শক্তি, এদের সঠিক পথে পরিচালিত না করতে পারলে তার খেসারত সমগ্র জাতিকেই দিতে হবে।
তরুণরাই দেশের সার্বিক কল্যাণ, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, উৎকর্ষতা সাধনের সাধক, উন্নয়নের ধারক-বাহক ও চালক।দেশে প্রায় সাড়ে তিন কোটি তরুণ৷ ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করতে গেলে এই বিশাল তরুণ প্রজন্মকে কর্মে নিয়োজিত করার ব্যবস্থা করতে হবে৷
তাই পরিশেষে বলি, আমাদের তরুণ সমাজকে আত্মমর্যাদা, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা জাগ্রত করতে হবে। কুসংস্কার, মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ থেকে দূরে থেকে তারা যাতে আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক, উদার ও নৈতিকতাসম্পন্ন বিবেকবান মানুষ হিসেবে সমাজে অবদান রাখতে পারে,দেশপ্রেমের মহান চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জাতির সার্বিক কল্যাণে তরুণসমাজ যেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সেভাবে তাদেরকে গড়ে তুলতে হবে।
মো: সোহেল রানা
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ (৩য় বর্ষ) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


