বাংলাদেশে “মৌলিক অধিকার” বিষয়টির বাস্তবচিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে গেছে, বাংলাদেশের ৭০% নাগরিক তাদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন না। আরও আলোড়ন সৃষ্টিকারী তথ্য হচ্ছে, ৯৭% নাগরিক মৌলিক চাহিদাগুলো মৌলিক অধিকার মনে করেন (আইন সংশ্লিষ্টতা ব্যতীত)। যদি মানুষ তাদের মৌলিক অধিকারগুলো সম্পর্কে না-ই জানেন, সেগুলো সম্পর্কে সচেতন না হন; তবে তা লঙ্ঘিত হলে প্রতিকার পাবার আশা করাটাই আকাশকুসুম চিন্তা! তাই জনসাধারণকে তাদের মৌলিক অধিকারগুলো সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি এবং তা লঙ্ঘিত হলে যথাযথ প্রতিকার পাবার প্রয়াসে আজকের এই লেখা।
সাধারণত মৌলিক চাহিদা হচ্ছে এমন কিছু বিষয় যা জীবন ধারণের জন্য মানুষের অবশ্য প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশ সংবিধানের ২য় ভাগে (রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি) অনুচ্ছেদ ১৫ তে মৌলিক চাহিদা সম্পর্কে বলা হয়েছে। মৌলিক চাহিদা সমূহের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা,বাসস্থান, চিকিৎসা, কর্মের অধিকার, বিশ্রাম লাভের অধিকার, বৃদ্ধ, শিশু, বিধবাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি। পক্ষান্তরে, মৌলিক অধিকার হচ্ছে এমন কিছু মানবাধিকার যা রাষ্ট্র সংবিধানের মাধ্যমে নাগরিক এবং কিছু ক্ষেত্রে অনাগরিকদের জন্য নিশ্চিত করে থাকে। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩য় ভাগে (অনুচ্ছেদ ২৬-৪৭ক) মৌলিক অধিকারসমূহ বিবৃত রয়েছে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, মৌলিক চাহিদা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৮(২) অনুসারে আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য নয়। তাই মৌলিক চাহিদা বাস্তবায়নে রাষ্ট্র আইনগতভাবে বাধ্য না। অন্যদিকে, মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে আদালত সাংবিধানিক ভাবে বাধ্য। এর বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি অনুচ্ছেদ ১০২ অনুসারে উচ্চ আদালতে রীট পিটিশন দায়ের করতে পারেন।
বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ থেকে ৪৪ পর্যন্ত মোট ১৮ টি মৌলিক অধিকারের কথা আলোচনা করা হয়েছে। তন্মধ্যে ৬ টি মৌলিক অধিকার তথা অনুচ্ছেদ ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৫, ৪১ ও ৪৪ দেশের নাগরিক এবং বিদেশী সকলেই ভোগ করতে পারবেন। বাকি ১২ টি মৌলিক অধিকার শুধুমাত্র বাংলাদেশি জনগণই ভোগ করতে পারেন।
মৌলিক অধিকার গুলো হল :
১) ২৭. আইনের দৃষ্টিতে সমতা,
২) ২৮. ধর্ম, পরভৃতি কারণের বৈষম্য করা যাবেনা,
৩) ২৯. সরকারী নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতা,
৪) ৩০. বিদেশী খেতাব প্রভৃতি গ্রহণ নিষিদ্ধকরণ,
৫) ৩১. আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার,
৬) ৩২. জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকার-রক্ষণ,
৭) ৩৩. গ্রেপ্তার ও আটক সম্পর্কে রক্ষাকবচ,
৮) ৩৪. জবরদস্তি-শ্রম নিষিদ্ধকরন,
৯) ৩৫. বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে রক্ষন,
১০) ৩৬. চলাফেরার স্বাধীনতার,
১১) ৩৭. সমাবেশের স্বাধীনতা,
১২) ৩৮. সংগঠনের স্বাধীনতা,
১৩) ৩৯. চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক স্বাধীনতা,
১৪) ৪০. পেশা বা বৃত্তির-স্বাধীনতা,
১৫) ৪১. ধর্মীয় স্বাধীনতা,
১৬) ৪২. সম্পত্তির অধিকার,
১৭) ৪৩. গৃহ ও যোগাযোগের সংরক্ষন।দ,
১৮) ৪৪. মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ।
সংবিধানের ২৬(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে এই অধিকারগুলোর সাথে অন্য যেকোনো আইন পরিপন্থী হলে বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ হলে সে অসামঞ্জস্য আইন বাতিল বলে গণ্য হবে। ৪৪ ও ১০২ অনুচ্ছেদ হাইকোর্ট বিভাগকে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার প্রদানের আদি এখতিয়ার তথা ক্ষমতা দিয়েছে; যা রীট পিটিশন বলে খ্যাত। রীট শব্দের আভিধানিক অর্থ আজ্ঞালেখ বা লিখিত দলিল। রীট মোট ৫ প্রকার। এগুলো হচ্ছে –
১) নিষেধাজ্ঞামুলক রীট (Writ of Prohibition) : হাইকোর্ট বিভাগ যেকোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে প্রজাতন্ত্র বা কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিষয়াবলীর সাথে সংশ্লিষ্ট যেকোনো দায়িত্ব পালনরত ব্যক্তিকে আইনের দ্বারা অনুমোদিত নয় এমন কোনো কার্য হতে বিরত রাখার জন্য আদেশ প্রদান করতে পারবেন।
২) পরমাদেশ বা হুকুমজারী রীট (Writ of Mandamus) : হাইকোর্ট বিভাগ যেকোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে প্রজাতন্ত্র বা কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিষয়াবলীর সাথে সংশ্লিষ্ট যেকোনো দায়িত্ব পালনরত ব্যক্তিকে আইনের দ্বারা তার করণীয় কার্য করার জন্য আদেশ প্রদান করতে পারবেন।
৩) উৎপ্রেষণ রীট (Writ of Certiorari) : হাইকোর্ট বিভাগ যেকোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে প্রজাতন্ত্র বা কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিষয়াবলীর সাথে সংশ্লিষ্ট যেকোনো দায়িত্ব পালনরত ব্যক্তির কৃত কোনো কার্যের আইনগত কোনো কার্যকরতা নেই বলে ঘোষণা করে হাইকোর্ট আদেশ প্রদান করতে পারবেন।
৪) বন্দী দর্শন (Writ of Habeas Corpus) : হাইকোর্ট বিভাগ যেকোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে আইনসঙ্গত কর্তৃত্ব ব্যতিরেকে বা বেআইনী উপায়ে কোনো ব্যক্তিকে প্রহরায় আটক রাখা হয়নি বলে যাতে হাইকোর্টের নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হতে পারে, সেজন্য প্রহরায় আটক উক্ত ব্যক্তিকে হাইকোর্টের সম্মুখে আনয়নের আদেশ প্রদান করতে পারবেন।
৫) কারণ দর্শাও রীট (Writ of Quo Warranto) : হাইকোর্ট বিভাগ যেকোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে কোনো সরকারি পদে আসীন বা আসীন বলে বিবেচিত কোনো ব্যক্তিকে তিনি কোন কর্তৃত্ববলে অনুরূপ পদমর্যাদায় অধিষ্ঠানের দাবী করেছেন, তা প্রদর্শনের নির্দেশ প্রদান করে হাইকোর্ট বিভাগ আদেশ দান করতে পারবেন।
বাংলাদেশ সংবিধানে রীটগুলোর নাম উল্লেখ হয়নি, তবে ১০২ অনুচ্ছেদ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সবগুলো রীটের বিষয়বস্তু এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অপরদিকে, দুটি ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হলেও প্রতিকার দাবি করা যায় না। যথা –
১) সংবিধান এর ৪৭ অনুচ্ছেদের বিধানসমূহ কার্যকর করার ক্ষেত্রে ১০২ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রীট করা যাবে না।
২) জরুরি অবস্থা ঘোষণা কালে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪১গ অনুযায়ী মৌলিক অধিকারসমূহ স্থগিত হয়ে যাবে।
একটি ছোট্ট অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে ইতি টানছি। ব্রিটিশ কাউন্সিলের এ্যাক্টিভ সিটিজেন ইয়ুথ লিডারশীপ ট্রেনিং করছি, সাথে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টেরর নানা বর্ষের শিক্ষার্থীবৃন্দ। সেখানে একটা পুরো সেশন থাকে মৌলিক অধিকার নিয়ে। সেশনের পূর্বে যখন সকলকে আমাদের মৌলিক অধিকার কি কি জিজ্ঞেস করা হলো, সকলে ৫ টি মৌলিক চাহিদার কথা গড়গড় করে বলে দিলেন। আমি তাদের কোনো দোষ দিচ্ছি না তবে বিশ্ববিদ্যালয় একটি দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ আর সেখানকার শিক্ষার্থীবৃন্দ সে দেশের সুনাগরিক হিসেবে বিবেচিত। সেই সুনাগরিকরাই যদি নিজের অধিকার নিয়ে সচেতন না হয় তবে সাধারণ জনগণের অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। তাই আসুন আমরা সকলে নিজের মৌলিক অধিকারগুলো জানি, অন্যের অধিকার যেন খর্ব না হয় সেদিকে সচেতন হই এবং এসব অধিকার কোনোভাবে লঙ্ঘিত হলে আইনত ব্যবধা গ্রহণ করি।
লেখক : মোঃ শওকত আলম ফয়সাল
শিক্ষার্থী,
আইন বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।


