সব
facebook apsnews24.com
হৃদয়ের রাজা প্রফেসর ড.শাহ আলম - APSNews24.Com

হৃদয়ের রাজা প্রফেসর ড.শাহ আলম

হৃদয়ের রাজা প্রফেসর ড.শাহ আলম

মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম

শ্রদ্ধেয় শাহ আলম স্যারকে নিয়ে সবাই সবকিছু লিখে ফেলেছেন। তাঁর কর্ম, গবেষণা, শিক্ষা সবকিছু সকলের লিখায় উঠে এসেছে। আমি স্যার কে নিয়ে কিছু লিখতে পারিনি। আরেকটা কারণ, সকলের এত অসাধারণ লিখার পর পর আমার লিখা বিরানি খাওয়ার সময় এলাচিতে কামড় পড়ার মত হবে জানতাম, তাই লিখিনি। বিশেষ করে বন্ধু খালেদ,ফারুকী, ফজলুল বারী স্যার, ছোট ভাই ড. মঈন, বড় ভাই মোস্তফা নাসের এঁদের লিখার পর আর সাহসে কুলোয় নি। তবে স্যার কে নিয়ে বিক্ষিপ্ত কিছু ভাবনা মনে আসায় তা লিখে রাখলাম। গতানুগতিক অর্থে কোন লিখা নয়। তাই বিরক্তিবোধে ক্ষমাপ্রার্থী)

ভিলেজ মার্কেট। এটা সেটা কেনাকাটা করার ফাঁকে আমি ছোট বেলায় এক মহা আশ্চর্য জিনিশের সামনে দাঁড়িয়ে পড়তাম। বিশাল আকারের টেপ রেকর্ডার কথা বলছে। টেপ রেকর্ডারের সাথে কোন তারের সংযোগ নাই। রেকর্ডারে সামনে থরে থরে সাজানো থাকতো ধনেশপাখির ঠোঁট, বনরুইয়ের চামড়া, কিছু জীবিত তক্ষক ইত্যাদি। কথাগুলো বলছে একজন লোক কিন্তু তার ঠোঁট নড়ে না। খালি হাত নাড়ায়, আগে -পিছে করে, গোলাকার ভঙ্গি করে, জোরের উপর কোমরে বারি দেয়। অবাক করা বিষয় ছিল, প্রতিটি অঙ্গভঙ্গির সাথে রেকর্ডারে বলা কথাগুলোর অদ্ভুত সাযুজ্য ছিল। মনে হত যেন লোকটিই কথা বলছে।

আমাদের সিক্সথ ব্যাচ। চবি আইন ষষ্ঠ ব্যাচের কথাই বলছি। আমাদের দু’জন মামুন বন্ধু আছে। দুজনেই আমাদের অসম্ভব প্রিয়। তাদের নামের আগে আছে বিশেষ বিশেষণ বা উপাধি। একজন ফার্স্টক্লাস মামুন আরেকজন ডিন মামুন। বন্ধু ফার্স্টক্লাস মামুন এখন আমাদেরই আইন বিভাগের শিক্ষক। তার এনাটমি অন্যদিন। রইল বাকি ডিন মামুন। বিশ্বাস করুন, সে শিক্ষকতাই করে না। তবু ডিন, আমাদের অতীব পছন্দের ডিন।
ডিন তো একজনই। নাম তার “শাহ আলম”। শাহ আলম হলো দুনিয়ায় রাজা। দুনিয়া ধন্য হয়েছে মানুষেরই হৃদয় দিয়ে। অগণিত হৃদয় জয় করে শাহ আলম হয়ে গেছেন হৃদয়ের রাজা। বলছিলাম আমাদের প্রিয় শিক্ষাগুরু, কিংবদন্তিতুল্য জ্ঞানতাপস প্রফেসর ড. শাহ আলম স্যারের কথা।

নাসিরের ঝুপড়ি। ষষ্ঠীরা এডভার্স পজেশন এর মাধ্যমে মালিকানা নিয়েছে সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকেই। অন্য ব্যাচ একটু আড়চোখে তাকায়, বসতে চায় কিন্তু “উপায় নাই গোলাম হোসেন টাইপ” নাসিরে ঝুপড়ির দখল কলামে ষষ্ঠ ব্যাচের নাম লিখা। সেই ঝুপড়িতেই আমরা উপভোগ করতাম মামুনের ডিনশীপ। মাঝখানে দাড়ানো মামুন শুরু করত তার কসরত। কি অদ্ভুত! স্টাইল, বাচন ভঙ্গি- Grundnorm is a concept in the Pure Theory of Law created by Hans Kelsen, a jurist and legal philosopher. Kelsen used this word to denote the basic norm, order, or rule that forms an…..

আবার হাতটা গোলাকার করে যখন ঘুরিয়ে আনছে তখন আমাদের আর বুঝার বাকী থাকে না কি বলবে ” hierachy of norms” refers to the order or importance in which a norm is considered within a legal system.

Kelsen এর pure theory পড়ানোর পরের ক্লাসে স্যার হঠাৎ “পড়া ধরা” শুরু করে দিলেন। আমাদের দিয়ে আর ঐ সব হয়? সারি সারি দাঁড়িয়ে পড়লাম। স্যারের মেজাজ তখন ১৪০০° সেলসিয়াসে ফুটছে। একজন সাহস করে “কেলসেন” সাহেব কে নিয়ে কিছু বলতেই স্যার হুংকার ছাড়লেন। রক্তিম চক্ষু গোলাকার শেপে এনে বলে উঠলেন ” Kelsen theory is my foot”. আমাদের মধ্যে আর “আমরা” নেই। । অবতার হয়ে এগিয়ে এলেন “বাফেলো সোলজার “খ্যাত আমাদের বন্ধু মেলবিন। বলল, “স্যার, মনে হয় আজ আপনার মন ভাল নেই, আমরা স্যার আপনাকে কষ্ট দিয়েছি,আমরা রেগুলার পড়াশোনা করবো।” কিছুটা নিরবতা নেমে এলো ল’ ক্লিনিকের দ্বিতীয় তলায়।
মহামতি আলেকজান্ডার সম্রাট হবার পর এরিস্টটল এথেন্সে ফিরে আসেন এবং তার নিজস্ব একাডেমি ‘লাইসিয়াম’ (Lyceum) প্রতিষ্ঠা করেন, যার সদস্যদেরকে ‘Peripatetics’ বলা হতো। পায়চারি করে শিক্ষাদানের পদ্ধতির কারণেই সম্ভবত এ নামের উদ্ভব। পায়চারী করতে করতে পরক্ষণেই হৃদয়ের রাজা শাহ আলম তার জ্যোতির্ময় হাসি দিয়ে আমাদের চৌচির হয়ে যাওয়া পরাণগুলোকে বারির ফল্গুধারায় ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন।

মামুন তার অভিনয় শেষ করল। তীব্র করতালি মধ্যেই একটু আগেই একটা “পলমল “শেষ করা আমাদের এক বন্ধু আবার নাসিরকে বলছে,” আরেক টা দে”।

আহ! আহারে.. আমাদের শাহ আলম স্যারটা যদি আরও বছর চল্লিশেক বাঁচতেন। হয়তো চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলতেন। হাত পা নাড়াতে পারতে না। হয়তো শুধু কথা বলতে পারতেন। তাতেও অসুবিধা ছিল না। আমরা নতুন পুরাতন সব শিষ্যরা তাকে ঘিরে দাঁড়াতাম। আশ্চর্য টেপ রেকর্ডারের মত বলতেন আর ডিন মামুন প্রকৃত ডিনের পাশে দাড়িয়ে তার দীর্ঘদিনের অনুশীলিত কসরতে মুগ্ধ করতেন “শাহ আলমের” ভক্তদের।

“সব চাওয়া পৃথিবীতে পাওয়া হয় না, ভাঙা মন নিয়ে তুমি আর কেঁদো না।” প্রথম অংশ মেনে নিয়েছি; দ্বিতীয় অংশে আমরা পরাজিত। কিন্তু মেনে নেয়া অংশের একটা শব্দ “পৃথিবীতে”। তার মানে আরেকটা জগত আছে। আমি আরেকটা জগতের বিশ্বাসীদের মধ্যে একজন। ওখানটাতেই আবার শাহ আলমে স্যারের সাথে দেখা হবে আশা রাখি। জান্নাতি মানুষের অনেক বৈশিষ্ট্যই প্রফেসর শাহ আলম ধারণ করতেন।

তিনি এই বিশ্বজগতের নিগূঢ় রহস্য নিয়ে আলোচনার চেয়ে জীবন ও সমাজের বাস্তব বিষয়াদি নিয়ে আলোচনায়ই তিনি ছিলেন বেশি আগ্রহী। যেমন, সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে মানুষের আচরণ কেমন হওয়া উচিত? মানুষের মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব কিসে নিহিত? – এ জাতীয় জীবনধর্মী প্রশ্নের উত্তরানুসন্ধানই ছিল তার চিন্তার অগ্রাধিকার। ন্যায় (justice) ও শুভ (goodness) কী, তা জানতে তিনি আগ্রহী ছিলেন ন্যায়নিষ্ঠ ও শুভজীবন-যাপনের জন্য। তার দৃঢ় বিশ্বাস ন্যায় ও শুভ কী, তা না জেনে কেউ ন্যায়বান ও কল্যাণনিষ্ঠ হতে পারে না। তার মানে, জ্ঞান ও প্রজ্ঞাই মানুষের সদাচরণ ভিত্তি। আচরণের জন্য জ্ঞানবুদ্ধি যে শুধু অপরিহার্য তাই নয়, সত্যিকারের জ্ঞানী ব্যক্তি কখনো অন্যায় করতেই পারেন না। আবেগ-উচ্ছ্বাস নয়, প্রজ্ঞাই (reason) ছিল তার চিন্তা ও কর্মের চালিকাশক্তি। প্রজ্ঞার আলোকে তিনি যে মূল্যবোধ দর্শন করেছেন, তাকেই তিনি নিষ্ঠার সাথে অনুশীলন করেছেন। ন্যায় ও কল্যাণের ধারণা থাকা সত্ত্বেও মানুষ কী করে অন্যায়-অকল্যাণে প্রবৃত্ত হতে পারে, এ ছিল তার চিন্তার বাইরে। বিদ্যার লন্ঠন হাতে উপচে পড়া মায়ার থলি নিয়ে পথচলা এ গুরু এমন দীক্ষাই দিয়েছেন আমাদের।

আমাদের পড়াতে এসে স্যার হারিয়ে ফেলেছিলেন একমাত্র আদরের প্রিয় ছোট সন্তানটি কে। ভাার্সিটির পুকুরে পড়ে এ ছোট মানুষটি মারা যায়। স্যার অনেক কষ্ট পেয়েছেন জানতাম। কোন সাত্বনাই যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু তারপরেও একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে.- Hazrat Abu Huraira. It is narrated that the Prophet (peace and blessings of Allaah be upon him) said:
“The small children will be helpful for Paradise. They will continue to pull their father by the side of the cloth, they will not stop, they will not separate until they take (the father) to Paradise ”(Musnad Ahmad)
Mishkat-1855.

জান্নাতের অপরিসীম নাজ নেয়ামতে মাতোয়ারা হয়ে আমরা সকলে ( আল্লাহ যেন তাই কবুল করেন) যখন খুনসুটিতে ব্যাস্ত, শাহ আলম স্যার হাজির। বলা শুরু করেছে ” তোমাদের একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমার রক্তের ধারায় প্রতিভার জ্বলন্ত অগ্নিকণা অসাধারণ স্ফুরণে জ্বলে উঠেনি কখনো- অসম্ভবের নেশা জন্মান্ধ আক্রমনে হৃদয়কে হিংস্র করেনি। গৃহপালিত রক্তে আমি একটা নিরীহ আর গতানুগতিক মানুষের হৃদয়কেই লালন করেছি আজীবন। আর এ হৃদয় দিয়েই তোমাদের ভালবেসেছি।”

হঠাৎ বন্ধু দেলোয়ার আর শাওন( মোটা) স্যারকে কাঁধ তুলে নেয়। আমরা পিছু পিছু আসতে থাকি। স্যারকে নিয়ে আসা হয় স্বর্গোদ্যানে। ল’ ফ্যাকা্লটিতে মন চাইলেও যা পারিনি তাই আমরা করে বসলাম। ফুটবল ম্যাচ জয়ের পর যেভাবে কোচকে খেলোয়াড়েরা শূন্য তুলে আবার ধরে ফেলে আমরাও স্যারকে শূন্যে তুলে হিপ হিপ হুররেএ আওয়াজ তুললাম। সন্ধ্যে নেমে এল।
ওমা! হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। আমরা সবাই অস্থির আবগাহনে মত্ত। পানি থেকে উঠে আসা বিচ্ছুরিত আলোক ভেতর সেই বৃষ্টি অবিরাম ঝরে সমস্ত রাতটাকে রোদনরূপসী করে তুলেছে।
ভুবনভোলানো হাসি দিয়ে শাহ আলম স্যার হাতছানি দিয়ে ডাকছে অদুরে দাড়িয়ে থাকা তার প্রিয় ছোট সন্তানটিকে।

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২০।

  • 3
    Shares

আপনার মতামত লিখুন :

পারিবারিক আদালতে  কখন, কিভাবে যাবেন ও সমাধান

পারিবারিক আদালতে কখন, কিভাবে যাবেন ও সমাধান

অভিভাবকেরা দায় এড়াবেন কিভাবে?

অভিভাবকেরা দায় এড়াবেন কিভাবে?

ধর্ষণ : আমাদের সতর্কতা

ধর্ষণ : আমাদের সতর্কতা

পরিবহনগুলোকে সিসিটিভির আওতায় আনা প্রয়োজন।

পরিবহনগুলোকে সিসিটিভির আওতায় আনা প্রয়োজন।

বেকারত্ব অথবা আইন সনদ নিবন্ধন পদ্ধতি সংস্কার

বেকারত্ব অথবা আইন সনদ নিবন্ধন পদ্ধতি সংস্কার

অর্থপাচারকারীরা রাষ্ট্রের প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস

অর্থপাচারকারীরা রাষ্ট্রের প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন  
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার: ApsNews24.Com (২০১২-২০২০)

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ নুরুন্নবী চৌধুরী সবুজ
01774-140422
প্রকাশকঃ আইনী পাঠশালা গ্রুপ
২২ চ্যামেলীবাগ (সিআইডি অফিসের পাশে) রমনা থানা, ঢাকা-১০০০।
01625-461876, 01771-784299
[email protected], [email protected]
Developed By Feroj

ব্রেকিং নিউজ