তন্ময় কুমার সাহা, নরসিংদী প্রতিনিধি :
করোনা চিকিৎসায় অকুতোভয় যোদ্ধা হিসেবে রোগিদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন নরসিংদী ১০০ শয্যা জেলা হাসপাতালের (কোভিড -১৯ ডেডিকেটেড) আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ও হৃদরোগ বিশেজ্ঞ (আরএমও) ডা. এ.এন.এম মিজানুর রহমান ।
নীরব সেনা হিসেবে কাজ করছেন তিনি। ইত্যিমধ্যে তার সেবায় সুস্থ হয়ে কোভিড ডেলিকেটেড জেলা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন প্রায় দুই শত করোনা রোগী।
জানা যায়, করোনা পরিস্থিতির প্রায় শুরু থেকে নরসিংদীতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রোগী সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার ১০০ শয্যা জেলা হাসপাতালটিকে কোভিড ৮০ শয্যা হাসপাতাল ঘোষণা করা হয়। কোভিড হাসপাতাল ঘোষণার পর ডা. মিজানকে এর মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরিবারের লোকজনদের ছেড়ে রাতদিন করোনা রোগীদের সেবায় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। যার ফলশ্রুতিতে নরসিংদীর সব মানুষের কাছে প্রশংসিত আরএমও ডা. মিজান।
সারাদেশে করোনা পরিস্থিতি যখন ভয়াবহ তখন নরসিংদী অবস্থান বিভিন্ন জেলার মধ্যে ছিল পঞ্চম। সে সময় নরসিংদী কোভিড জেলা হাসপাতাল গিয়ে দেখা যেত, করোনা উর্পসগ নিয়ে পরীক্ষা করাতে আসা রোগীদের র্দীঘ লাইন। স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের নমুনা সংগ্রহ করছেন। আর সবাইকে তদারকি করছেন ডা. মিজানসহ তার সহকর্মীরা। গত (৬ এপ্রিল) নরসিংদীতে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। তার ঠিক দুই দিন পর জেলা হাসপাতালের মালি করোনায় আক্রান্ত হন। হাসপাতালের মালি করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসকদের মধ্যেই করোনা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নরসিংদীর অনেক ডাক্তার করোনার ভয়ে পিছু হটে যায়। সেই সময়ে মরনব্যাধী এই ভাইরাস থেকে জেলাবাসীকে মুক্ত করতে সকল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে করোনা রোগীদের নিরলস ভাবে সেবা দিয়ে মানবিকতার উদাহরন রাখেন এই চিকিৎসক।
ডা. মিজানুর রহমান স্বাস্থ্য সেবায় বিশেষ অবদানের জন্য ২০১৬ সালে কাইজেন রোডস মডেল এওয়ার্ড অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক পাবলিক সার্ভিস ডে ২০১৮ তে জেলা প্রশাসন জেলা পর্যায়ে তিনি শ্রেষ্ঠ কর্মকর্তা নির্বাচিত হন। তিনি ২০১৯ সালে স্বাস্থ্য সচিব কর্তৃক ধন্যবাদ পত্র লাভ করেন। ওই বছর তিনি ইনোভেশন শোকেসিং অনুষ্ঠানে ঢাকা বিভাগ কমিশনার কর্তৃক পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও তিনি নরসিংদী পুলিশ সুপার কার্যালয় হতে ও বিএমএ সহ অন্যান্য সংগঠন থেকে ধন্যবাদপত্রসহ বিভিন্ন ভাবে সম্মানে ভূষিত হন।
বর্তমানে করোনা সংক্রমণ থাকলেও দেশের মানুষের মধ্যে কেমন যেন গাঁ সহা হয়ে গেছে। মানুষ এখন আর মরনব্যাধী ভাইরাসকে খুব একটা ভয় পায়না। দিন দিন মানুষের জীবন যাত্রার মান স্বাভাবিক হয়ে আসছে। সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রার মান স্বাভাবিক হতে থাকলেও নরসিংদী করোনা ডেলিকেটেড হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্টাফদের অবস্থা আগের মতই রয়েছে। তেমন কোন পরিবর্তন এখানে লক্ষ্য করা যায় না। শুধু মাত্র আগের তুলনায় নমুনা সংগ্রহ কিছুটা কমেছে।
নরসিংদী করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ী ফিরে গেছেন এমনই একজন নরসিংদী জেলা কৃষকলীগের সভাপতি আসাদুজ্জামান। তার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আরএমও ডা. মিজানুর রহমান আমার দৃষ্টিতে একজন মানবিক ডাক্তার। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে মানব সেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আমি যখন কোভিড-১৯ পজিটিভ ছিলাম তখন তিনি প্রতিদিনই আমাদের খোঁজখবর নিতে আসতেন। আমাদের খুব কাছ থেকে কুশলাদি জিজ্ঞেস করতে। কোন ধরনের সমস্য হচ্ছে কিনা বা ঔষধপত্র আছে কিনা সে কথাও জানতে চাইতেন। এছাড়া মোবাইল ফোনেও আমিসহ অন্যান্য রোগীদের কাছ থেকে সার্বিক বিষয়াদি জানতে চাইতেন। ডিউটি ডাক্তার আসছেন কিনা বা নার্সসহ অন্যান্যরা সঠিক সেবা দিচ্ছিন কিনা এখবর জানতে চাইতেন। চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি আমাদের মনোবল শক্ত করতে পরামর্শসহ বেঁচে থাকার প্রেরণা জুগিয়েছেন। আমাদেরকে সব সময় মানুষিকভাবে চাঙ্গা রেখেছেন, বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছেন।
ডা. মিজানুর রহমান বলেন, আমাদের হাসপাতালে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ জন রোগী করোনা পরীক্ষা করাতে আসতেন। আমরা পরীক্ষা করাতে পারতাম ৪০-৫০ জনের মতো। আরেকটু বেশি পরীক্ষা করাতে পারলে রোগী শনাক্ত বেশি হতো। আমাদের এখন আইসিইউ, পিসি আর ল্যাব, সেন্ট্রাল অক্সিজেনের দরকার। নরসিংদীর বিশিষ্ট শিল্পপতি আব্দুল কাদির মোল্লার অর্থায়নে ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেই সাথে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিএম এর সহযোগিতায় সেন্ট্রাল অক্সিজেন স্থাপনের কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে। সেন্ট্রাল অক্সিজেন স্থাপনের কাজ হয়ে গেলে আমার রোগিদের আর ভাল স্বাস্থ্য সেবা দিতে পারব। স্বাস্থ্য বিভাগের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, বিএমও, গণমাধ্যমকর্মী ও সুশীল সমাজের সকলের আন্তরিক সহযোগিতা পেলে আমাদের সকল চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভাল সেবা দিতে বদ্ধ পরিকর।
করোনা পরিস্থিতির এসময়ে করোনা রোগীদের পাশে থেকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে তাদের সুস্থ করে তুলতে ডা. মিজানুর রহমান ও তার পুরো টিম যে ত্যাগ স্বীকার করেছে তার জন্য তাদের প্রতি নত মস্তিস্কে কুর্নিশ জানায় নরসিংদীর সাধারণ মানুষ। সেই সাথে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।


